এযাবৎ 50 টি গ্রন্থ সংযোজিত হয়েছে।
[স্থান – দেবলোক। দেবাধিপতি, দেবকুমারগণ ও দেবকন্যাগণের আহূত সভা-মণ্ডপ]
(দেবকুমার ও দেবকন্যাগণের গান)
জাগো
জাগো দেবলোক।
এল
স্বর্গে কি মৃত্যুর ভয় দুখ-শোক॥
সাত
সাগরের গড়খাই পার হয়ে ওই
এসে
পিশাচ প্রেতের দল নাচে থই থই,
জাগো
সুর-ধীর দেব-বালা মাভৈঃ মাভৈঃ
নব
মন্ত্র-পূত নব-জাগরণ হোক॥
ওরা
আনিয়াছে পাতালের ভীতি মারিভয়,
মোরা
ভয়ে শুধু পরাজিত, শক্তিতে নয়।
ওঠো ওঠো বীর উন্নত-শির দুর্জয়,
ভেদিয়া কুয়াশা মায়ার,
আনোআশার আলোক॥
দেবাধিপতি
:
মাভৈঃ! মাভৈঃ!! বন্ধুগণ, আমরা এতদিনে আমাদের মন্ত্রের সন্ধান পেয়েছি। সে মারণ-মন্ত্র নয় – মরণ-মন্ত্র। আমরা – দেবলোকবাসী এতদিন নিজেদের অমর মনে করে জীবনকে অবহেলা করেছি। অমৃতকে পচিয়ে মদ করে তারই নেশায় যখন বুঁদ হয়ে গেছি, তখনই এসেছে সাগর-পারের নির্বাসিত অভিশপ্ত প্রেত-পিশাচের দল।তারা আমাদের প্রমত্ততার – জড়তার অবকাশে আমাদের অমৃত, কবচ, শক্তি সব কিছু অপহরণ করেছে। আজ বিশ্ববাঞ্ছিত দেবলোক নিরামৃত, নির্জীব, নিষ্প্রাণ, শক্তিহীন। আমাদেরই পাপে আজ তারা মৃত্যুঞ্জয়ের বর লাভ করে দেবলোক জয় করেছে। আমরা আজ মৃত্যুঞ্জয়ের প্রসাদ হতে বঞ্চিত সত্য– আজ আমাদের তপস্যার শক্তি অপহরণ করে প্রেতের দল শক্তিমান সত্য – তবু আজ একমাত্র আশা আমরা আমাদের দুরবস্থা সম্বন্ধে সচেতন হয়েছি। আমাদের হস্তপদের অশেষ বন্ধনের দারুণ পীড়া অনুভব করার চেতনা ফিরে পেয়েছি।
সমবেত কন্ঠে
:
সাধু! সাধু!
দেবাধিপতি
:
আমার পরম স্নেহাস্পদ পুত্রকন্যা-স্থানীয় দেবকুমার ও দেবকন্যাগণ! তোমাদের এক শতাব্দী পূর্বে আমার জন্ম, আর আমাদেরই পাপে তোমরা আজ প্রেতের মায়ায় বদ্ধ – কারারুদ্ধ, শৃঙ্খলাবদ্ধ। আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমরা করছি – দেবলোকে জরা-মৃত্যুর, দুঃখ-তাপের বলি হয়ে। তোমরা নিষ্পাপ, তোমাদের পিতৃ-পিতামহের পাপে তোমরা আজ প্রেতাধীন। আমরা ভূতাধীন – অতীতের দাস, তোমরা বর্তমান শতাব্দীর নবজাত শিশু। তোমরা অতীতের দাসকে – ভূতের অধীনকে মুক্ত করো। পদাঘাতে পতিত করো ভূতকে – অতীতকে, দক্ষিণ করে কর মিলিয়ে টেনে তোলো ভবিষ্যৎকে!
সমবেত কন্ঠে
:
সাধু! সাধু! জয় দেবাধিপতির জয়!! অমর দেবলোকের জয়!!
দেবাধিপতি
:
দেবলোকের জয়ধ্বনি করো, দেবাধিপতির নয়। আমি অতীতের লজ্জা, ভূতের লাঞ্ছনা আমায় অপবিত্র করেছে!
দেব-সংঘের একজন
:
না। না। আপনি তার ব্যতিক্রম। সত্য, আপনি জরায় ন্যুব্জ কিন্তু ওই ন্যুব্জ দেহই অতীত হতে বর্তমানে আসার সেতু।
সমবেত জয়ধ্বনি
:
সাধু! সাধু!! বেশ বলেছ ভাই! বেঁচে থাকো!
দেবাধিপতি
:
তোমাদের এই শ্রদ্ধাই আমার সকল কলঙ্ক, সকল লজ্জাকে ধুয়ে মুছে দিয়েছে। তাই আজ আমি তোমাদের মাঝে দাঁড়াবার দুঃসাহস অর্জন করেছি। আমি বলছিলাম – আমরা আমাদের ব্রহ্মাস্ত্রের সন্ধান পেয়েছি। যে অস্ত্র ধাতু দিয়ে তৈরি নয়, সে অস্ত্র বাণীর। সে অস্ত্রের নাম ‘মাভৈঃ!’
সকলে
:
মাভৈঃ! মাভৈঃ!
দেবাধিপতি
:
হাঁ, ওই মন্ত্র উচ্চারণ করো সকলে। মাভৈঃ! মাভৈঃ! ভয় নাই! শুধু এই বাণীর আশ্বাসে – এই মন্ত্রের জোরেই আমরা অভিশপ্ত-আত্মা ভূতের দলকে আবার সাগর-পারে তাড়িয়ে রেখে আসব।
সকলে
:
মাভৈঃ! জয় দেবলোকের জয়!
জনৈক দেবযুবা
:
শুধু বাণীর আশ্বাসে আমরা বিশ্বাসী নই, দেবাধিপতি। আমরা বলি, ‘এহ বাহ্য!’
সমবেত দেবসংঘ
:
বসে পড়ো! বসিয়ে দাও!
দেবাধিপতি
:
(দক্ষিণ কর উত্তোলন করিয়া সকলকে শান্ত হইবার ইঙ্গিত করিলেন। দেবসংঘ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শান্ত মূর্তি পরিগ্রহ করিল) কে তুমি উদ্ধত যুবক? তোমাকে এই নিপীড়িত দেবপুরীর কোনো যজ্ঞে দেখেছি বলে তো মনে হয় না।
দেবযুবা
:
আমরা থাকি আপনাদের যজ্ঞের গোপনতম অন্তরালে, দেবাধিপতি! আমরা আপনার যজ্ঞের মন্ত্র-উপাসক নই – আমরা যজ্ঞের অগ্নি-পূজারি! আমরা যজ্ঞের আহুতি হয়ে আত্মবলি দিই, আর সেই আহুতিই হয়ে ওঠে লেলিহান অগ্নিশিখা। আমরা নিপীড়িত দেব-আত্মার দাহিকা-শক্তি।
দেবাধিপতি
:
চিনেছি তোমায়। তুমি বিপ্লবকুমার! বীর! আমার সশ্রদ্ধ নমস্কার গ্রহণ করো। তোমাদের প্রাণকে – তোমাদের দুর্দৈব বিলাসিতাকে আমি শতবার প্রণাম করেছি – কিন্তু তোমাদের এই পথকে মুক্তির শ্রেষ্ঠতম পন্থা বলে গ্রহণ করতে পারিনি। আমি ভূতগ্রস্ত, জরাগ্রস্ত, – জানি। তবু বলি – সৈনিকের দুর্ধর্ষতাই একমাত্র গুণ নয়। দুর্ধর্ষতা সৈনিককে করে শুধু সৈনিক, ধৈর্যই করে তাকে মহান।
বিপ্লবকুমার
:
আমাদের প্রণাম গ্রহণ করুন দেবাধিপতি! আপনাকে আমরা পূজা করি দেবতার অন্তরের রাজাধিরাজ বলে. কিন্তু আপনাকে কিছুতেই মনে করতে পারিনে – আপনি আমাদের যুযুৎসু সেনাদলের অধিনায়ক।
দেব-সংঘ
:
বসিয়ে দাও! বসিয়ে দাও! উন্মাদ! উন্মাদ!
বিপ্লবকুমার
:
হাঁ বন্ধু, আমরা সত্যসত্যই উন্মাদ। আমাদের উন্মাদনার গান শুনবে?
দেব-সংঘের কয়েকজন
:
এই রে! সর্বনাশ করলে এই পাগলাচণ্ডী! এইবার ধরলে বুঝি ভূতে!
[বিপ্লবকুমারের গান]
মোরা
মারের চোটে ভূত ভাগাব
মন্ত্র দিয়ে নয়।
মোরা
জীবন ভরে মার খেয়েছি
আর প্রাণে না সয়॥
তোদের
পিঠ হয়েছে বারোয়ারি ঢাক
যে চায় হানে মার,
সেই
ঢাক গড়িয়ে মারের পিঠে
পড়ুক না এবার!
তোরা
নবীন মন্ত্র শোন আমাদের–
‘প্রহারো ধনঞ্জয়!!’
দেব সংঘ
:
সাধু! সাধু! ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’! জোর বলেছে দাদা! বেঁচে থাক!
আছে
তোদের গায়ের ভূতের লেখা
হাজার মারের ঋণ,
এবার
ফিরিয়ে দিতে হবে সে মার
এসেছে আজ দিন।
ওরে
মন্ত্র দিয়ে হয় কি কভু
বনের পশু জয়।
ওরে
দৈন্যেরে তোর সৈন্য করে
রণের করিস ভান,
খর
-স্রোতের মুখে খড় ভেসে কয় –
‘সাগর-অভিযান!’
তোরা
যজ্ঞ করিস, অযোগ্য সব
প্রাণে মৃত্যুভয়!
তোদের
হাড্ডি গেছে মাংস গেছে
চামড়া মাত্র সার,
তোরা
তাই নিয়ে কি ভাবিস তোরা
যজ্ঞ-অবতার।
তোদের
শুষ্ক দেহে জ্বালা এবার
আগুন জ্বালাময়॥
দেব-যুবাগণ—জয় বিপ্লবকুমারের জয়! সকলের গান–
মোরা
মারের চোটে ভূত ভাগাব
মন্ত্র দিয়ে নয়।
দেবাধিপতি
:
আমি কি তা হলে বুঝব – এই তোমাদের ঈপ্সিত পথ? বন্ধুগণ! তা হলে আমায় বিদায় দাও। আমি জানি – ও-পথ মৃত্যুর পথ, জীবন জয়ের পথ নয়। মৃত্যু তো আমরা ভূতের হাত দিয়েই নিত্য-নিয়তি পাচ্ছি, ওর জন্য নতুন আয়োজনের তো কোনো দরকার নেই। আমরা চাই জীবন। এবং জীবন লাভ করতে হলে চাই – তপস্যা! যুদ্ধ নয়! যুদ্ধ করবে কার সাথে? এ মায়াবী ভূতের দল তো সামনে থেকে দিনের আলোকে যুদ্ধ করে না। এরা যুদ্ধ করে অন্ধকারের আড়ালে থেকে – অন্তরীক্ষে থেকে – পাতালতলে থেকে। শূন্যের সাথে যুদ্ধ করি কী দিয়ে? এরা শাসন করছে ভয় দিয়ে – অস্ত্র দিয়ে তো নয়। অস্ত্রধারীর বিপক্ষে অস্ত্র ধরা যায় – কিন্তু ভয় দেখানো ভূতের উপদ্রব হতে রক্ষা পেতে হলে মাভৈঃ-বাণীর ভরসা ছাড়া অন্য উপায় নেই!
[এমন সময় সভা-মণ্ডপে ভীষণ আর্তরব উঠিল। সভার সকলে যে যেদিকে পারিল – ভয়ে ছুটিয়া পলাইতে লাগিল। চতুর্দিকে ‘ভূত – ভূত’ রব উঠিতে লাগিল। ভূতেদের কাহাকেও দেখা গেল না। কেবল অন্তরীক্ষে কীসের ভীষণ শব্দ শোনা যাইতে লাগিল। সভার সমস্ত আলোক একসঙ্গে নিভিয়া গেল। মনে হইল, অসংখ্য কায়াহীন ছায়া বীভৎস মূর্তিতে সভা-মণ্ডপ ছাইয়া ফেলিয়াছে। বিপ্লবকুমার ও দেবাধিপতি ব্যতীত সভামণ্ডপে আর কাহাকেও দেখা গেল না।]
বিপ্লবকুমার
:
দেবাধিপতি। এই কাপুরুষের দল কি আপনার মন্ত্র-শিষ্য?
দেবাধিপতি
:
(হাসিয়া) এরাই কি তোমার যুদ্ধ-সেনা? জানি বন্ধু, আমাদের দেব-জাতির ক্লীবতা নির্লজ্জতার কত অতলতলে গিয়ে পড়েছে, তাই আমি বলি – এ জাতিকে দিয়ে যুদ্ধজয়ের কল্পনা একেবারে অসম্ভব।
বিপ্লবকুমার
:
এই অসম্ভবের সম্ভাবনার আশাতেই আমি ভবিষ্যৎকালের প্রতীক – যৌবনের প্রতীক পথে বেরিয়েছি, দেবাধিপতি! আমার জীবনে তারই শেষ ফলাফল দেখতে পাই। কিন্তু – এ কী! আমিও কি ভূতের মায়ায় আবদ্ধ? আমি আর নড়তে পারছিনে কেন?
দেবাধিপতি
:
বন্ধু! আমরা অনেক আগেই ভূতের মায়ায় বন্দি হয়েছি। আমাদের দুই জনেরই এক গতি। আমাদের জাতির অতীত ও ভবিষ্যৎ আজ এক সাথে বন্দি হয়ে পাতালপুরীর অন্ধকার আশ্রয় করে পড়ে থাকবে।
বিপ্লবকুমার
:
আপনার মন্ত্র হয়তো বাধাকে বাধা না দিয়ে জয় করা। কিন্তু আমি সে মন্ত্রের উপাসক নই, দেবাধিপতি। আমি এ বন্ধন ছিন্ন করব।
  
(বংশী বাদন ও সঙ্গে সঙ্গে সহস্র রক্ত-বেশ পরিহিত দেব-যুবার প্রবেশ। তাহারা আসিয়াই ঝড়ের বেগে বিপ্লবকুমারকে স্কন্ধে তুলিয়া লইয়া চলিয়া গেল। চতুর্দিকে ভূতের অবোধ্য ভাষায় ভীষণ কিচির-মিচির শব্দ শ্রুত হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে ভীষণ রক্ত-আলোকে দেখা গেল – বাঁদর, ভল্লুক, শৃগাল, কুকুর, শার্দূল, হায়েনা, খটাশ প্রভৃতি নানা মুখের নানা বীভৎস ভূতের দল দেবাধিপতিকে আকর্ষণ করিয়া লইয়া যাইতেছ। দেবাধিপতি প্রসন্ন হাসিমুখে তাহাদের অনুগমন করিতেছেন। সহসা নানাপ্রকার রথে আরও নানা মুখের ভূতের দল আসিয়া উপস্থিত হইল। আসিয়াই তাহারা দিকে দিকে রথ লইয়া বিপ্লবকুমারের দলকে ধরিতে বাহির হইয়া গেল। ভুতের মুখে নাকি সুরে শুধু এক শব্দ ধ্বনিত হইতে লাগিল – বিপ্লব-কুমার! বিপ্লবকুমার।)
ভূতের ভয় সূচী
আপনার জন্য প্রস্তাবিত
ভালো লাগা জানান
Scroll Up