এযাবৎ 50 টি গ্রন্থ সংযোজিত হয়েছে।
[দেবলোক। ভূত-নিবারণী সভার সভ্যগণ তাঁহাদের নব-নির্বাচিত সভাপতি জয়ন্তের প্রাসাদে কথোপকথন করিতেছেন।]
জয়ন্ত
:
আমি বলি কী, আমাদের বন্দি নেতা দেবাধিপতির নির্বাচিত পথই আমাদের বর্তমান অবস্থায় প্রকৃষ্ট পথ। অবশ্য অধিকাংশ সভ্যের মত হলে আমরা এর চেয়েও এক ধাপ উপরে উঠবার চেষ্টা করতে পারি।
জনৈক সভ্য
:
আমরা দেবলোকে এতদিন শুধু মাভৈঃ-বাণীর মন্ত্রই প্রচার করেছি। তাতে কাজ অনেকটা অগ্রসর হয়েছে। ভূতের ভয় দেবলোক হতে সম্পূর্ণরূপে অপসারিত না হলেও তাদের বিরুদ্ধে যে বিরাট অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে – তাতেই আমাদের কাজ অনেকটা অগ্রসর হবে। এই অসন্তোষের আগুনে ঘৃতাহুতি পড়লে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে শোষণ-শুষ্ক দেবলোক!
দ্বিতীয় সভ্য
:
আমিও বলি, আমরা তো হাতে মারতে পারব না ওদেরে। এখন ভাতে মারতে পারি কি-না তারই আয়োজন করতে হবে।
তৃতীয় সভ্য
:
কিন্তু এ ভূত যে আমাদের অন্নের চেয়ে রক্তই শোষণ করে বেশি। ওই রক্তখেগো ভূতকে ভাতে মেরে বিশেষ সুবিধে হবে বলে তো মনে হয় না।
দ্বিতীয় সভ্য
:
ভাতে মারা মানেই ওদের প্রাণ – আমাদের রক্ত শোষণে বাধা দেওয়া! তাহলেই ওদের আয়ু যাবে কমে। আমিও বলি যুদ্ধ করে ওদের কাটব কী, ওরা যে কন্দকাটা ভূত। ওদের রক্তপাত করলেই ওরা হয়ে উঠবে আরও ভীষণ, ছিন্নমস্তার মতো নিজের রক্ত নিজে পান করে উন্মাদনৃত্য শুরু করে দেবে।
জয়ন্ত
:
ও-কথার আলোচনায় এখন প্রয়োজন নেই। রক্তারক্তির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই। আমাদের এ অহিংসা যুদ্ধ। আমরা দলে দলে ধরা দিয়ে ওদের পাতালপুরীর সমস্ত রন্ধ্র বন্ধ করে দেব। যে অন্ধ-কারার ভয় দেখিয়ে ওরা আমাদের নির্বীর্য করে রেখেছে, সেই ভয়টাকেই আগে নিঃশেষ করে ফেলতে হবে। মারবে কতক্ষণ? ওদের মারের মুখে যদি আমাদের দেবলোকের সব শির এগিয়ে দিই, তাহলে দু-দিনেই ওদের মারের অস্ত্র যাবে ভোঁতা হয়ে – মারের শক্তি যাবে ফুরিয়ে।
চতুর্থ সভ্য
:
আমাদের দলপতি ঠিক বলেছেন। কিন্তু এই প্রতিরোধই যথেষ্ট নয়। ওরা আমাদের অমৃত অপহরণ করে তার বদলে যে বিষমাখা খাদ্য জোর করে খাওয়াচ্ছে – আমরা শুকিয়ে মরলেও তা আর গ্রহণ করব না। আমাদের লজ্জা নিবারণ করতে হয় ভূতুড়ে কিম্ভূতকিমাকার বস্ত্র দিয়ে, আমরা আর তা পরব না। নির্যাতন আরও বেশি চলুক, তবু ওদের দান গ্রহণ করে আমাদের পবিত্র দেব-কান্তিকে আর অপবিত্র পঙ্কিল করে তুলব না।
(হঠাৎ সম্মুখ দিয়া বিপ্লবকুমার চলিয়া গেল)
জয়ন্ত
:
ওকে চেনেন আপনারা? ওই বিপ্লবকুমার। কখনও গান গায় কখনও যুদ্ধ করে। কখন যে কী করে বুঝবার উপায় নেই। ভূতের চোখে ধুলো দিয়ে রাত-দিন ও এই দেবলোকে নানা মূর্তিতে বিপ্লবের আগুন জ্বেলে বেড়াচ্ছে। ভূতেদের চেষ্টার আর অন্ত নেই, ওকে বন্দি করার, কিন্তু কিছুতেই কিছু করতে পারে না। ও কী বলে, কী করে কিছুই বোঝা যায় না।
পঞ্চম সভ্য
:
ওই দেবলোকের একমাত্র যুবা – যে ভূতকেও ভয় দেখাতে সমর্থ হয়েছে। (উদ্দেশে নমস্কার করিলেন)
(জ্বলন্ত অগ্নি-বর্ণা স্বাহা দেবীর প্রবেশ। সকলে আসন ছাড়িয়া দাঁড়াইয়া দেবীকে অভ্যর্থনা করিলেন)
জয়ন্ত
:
আসুন দেবী। আপনারই কথা ভাবছিলাম আমি।
স্বাহা
:
আমি কিন্তু আপনার কথা ভেবে এখানে আসিনি, জয়ন্তদেব। আমি ভাবছিলাম ওই যুবকের কথা – যে এখনই গান গেয়ে চলে গেল।
জয়ন্ত (ম্লানমুখে)
:
বিপ্লবকুমারের কথা? কিন্তু ওর আদর্শ তো আমাদের আদর্শ নয়, দেবী!
স্বাহ্য
:
এতদিন তাই ভেবেছি। কিন্তু এখন ভেবে দেখলাম, আগুনকে ধোঁয়া করে রাখায় কোনো লাভ নেই, ওতে চক্ষুই জ্বালা করে – দমই বন্ধ হয়ে আসে – দাহ করে না। আগুন যদি আমরা জ্বালিয়েই থাকি, তাহলে ওকে তুষ-চাপা দিয়ে ধোঁয়া করে লাভ নেই, আগুন এবার ভালো করেই জ্বলে উঠুক।
জনৈক সভ্য
:
মার্জনা করবেন দেবী। আপনি আমাদের দেবী-শক্তি। সমগ্র দেবী-জাতির প্রাণ-শিখা। তবু জিজ্ঞেস করি, তাহলে এ-আগুনে কি আপনিই কুলোর বাতাস করবেন?
স্বাহা
:
বিপ্লবকুমারকে দেখে অবধি আমার মনে হচ্ছে আমাদের তাই করাই উচিত। পুরুষেরা যখন ভয়ে পিছিয়ে গেল, তখন নারীকেই এগিয়ে যেতে হবে বই কি! এমন পড়ে পড়ে আর কত দিন মার খাওয়া যায়? এর একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক!
তৃতীয় সভ্য
:
(হাসিয়া) আপনাদের রান্নাঘরে থেকে থেকে আগুনটা গা সওয়া হয়ে গেছে দেবী, তাই আপনারা হয়তো ওটাকে ভয় করছেন না, কিন্তু উনুনের আগুন আর বিপ্লবের আগুন এক জিনিস নয়!
স্বাহা
:
উনুনের আগুন আমরা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করি, কিন্তু আপনাদের মুখে আগুন উঠেও – এত ধূমপান করেও তো আগুনের ভয়কে ছাড়িয়ে উঠতে পারলেন না! উনুনের আগুনেও তো আপনাদের অনেকে পুড়েছে, এবার না হয় ওর চেয়ে প্রখর আগুনেই পুড়বে। আমাদের তো পুড়ে মরতেই জন্ম।
জয়ন্ত
:
আমাদের কোনো সভ্যের প্রগল্‌ভতার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি, দেবী। আপনি আমাদের পরিত্যাগ করলে আমরা সত্যসত্যই শক্তিহীন হয়ে পড়ব। আপনি দেবলোকের প্রাণস্বরূপা। আমাদের আছে শুধু অস্থি আর চর্ম, আপনাদের আছে প্রাণ। এই প্রাণশক্তি যেখানে যোগ দেবে – সেইখানেই জয় অবশ্যম্ভাবী।
স্বাহা
:
আমরা যদি সত্যিই দেবলোকের প্রাণশক্তি হই, এবং যেখানে যোগদান করি, সেইখানেই জয় অবশ্যম্ভাবী হয়, তাহলে আপনার দুঃখের তো কোনো কারণ দেখছিনে। দেবলোক ভূত-মুক্ত হোক এইতো আপনারা সকলে চান। সে মুক্তি আপনিই আসুক – আর বিপ্লবকুমারই আনুক – তাতে তো কিছু আসে যায় না।
জয়ন্ত
:
কিন্তু বিপ্লবকুমারের আন্দোলন সে মুক্তি আনতে পারবে না বলেই আপনাদের শক্তি সেখানে ব্যয় করে ব্যর্থতা আনতে নিষেধ করছি, দেবী। আমরা বলি, আমরা জয় করব সত্যের জোরে, আমরা সত্যাগ্রহী। বিপ্লবকুমার বলে, সে জয় করবে অস্ত্রের জোরে – সে বলে, সে অস্ত্রাগ্রহী। কিন্তু ভূতের অস্ত্রবলের কাছে ওর মূল্য কতটুকু!
স্বাহা
:
ও শুধু তাই বলে না। বলে ভূত আর পশু, দুইটা জাতই আগুনকে অতিরিক্ত ভয় করে। এ ভূতের অর্ধেকটা পশু, অর্ধেকটা ভূত। একবার ভালো করে আগুন জ্বেলে তুলতে পারলে এরা তল্পিতল্পা তুলে লম্বা দৌড় দেবে!
জয়ন্ত
:
আগুন তো আমরাও জ্বালাতে চাই, দেবী। সে আগুন অসন্তোষের আগুন।
স্বাহা
:
আগুন নয় জয়ন্তদেব, ও হচ্ছে ধোঁয়া। বড়ো বড়ো ওঝাদের দেখছি, তারা ভূত তাড়াবার জন্য শুধু ধোঁয়া আর সর্ষে-পড়াই ব্যবহার করে না,– উত্তম-মধ্যম মারও দেয়! নমস্কার! (প্রস্থান)
জয়ন্ত
:
আমি বিপ্লবকুমারের খুব বেশি বিরোধী নই, কিন্তু আমার মনে হয় – সে প্রস্তুত না হয়েই নেমেছে। এতে সে দেবলোকের ক্ষতিই করবে।
সভ্যগণ
:
(উঠিয়া পড়িয়া) এ সব আগুনের আলোচনার স্থান এ নয়। আমরা আমাদের সত্যচ্যুত হয়ে পড়ব এখানে থাকলে। এ আলোচনা আমাদের এবং আমাদের দেশের ক্ষতি করবে। আমরা আজ উঠলাম। আমাদের কর্তব্য নির্ধারণ অন্য দিন অন্য স্থানে হবে। (সকলের প্রস্থান)
(বিপ্লবকুমার ও স্বাহাদেবীর প্রবেশ)
বিপ্লবকুমার
:
আমি তখন এসে ফিরে গেছি, জয়ন্ত দেব। ওই ভীরু লোকগুলোকে ভয় করিনে, কিন্তু যখন ভাবি যে, দেবলোকের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে ওরাই – তখন আর ক্রোধ সংবরণ করতে পারিনে। তখন এলে একটা বিশ্রী কলহের সূত্রপাত হত ভেবেই চলে গেছি।
জয়ন্ত
:
কিন্তু এখনই বা এসেছেন কেন? আপনি তো জানেন, আপনাদের এবং আমাদের পথ একেবারে বিপরীতমুখী।
স্বাহা
:
সেই মুখকে ঘুরিয়ে একমুখী করার জন্যই আমি এসেছি, জয়ন্তদেব!
জয়ন্ত
:
সে অধিকারের মর্যাদাকে আপনিই আগে ক্ষুণ্ণ করেছেন দেবী। আপনি ক্ষমা করবেন, যদি আপনার অধিকারের সম্মান রাখতে না পারি। এ পথ এক হবার পথ নয়। আপনি মনে করছেন, আপনি এসেছেন আমাদের মাঝে সেতু হয়ে। কিন্তু তা নয়, বরং আমাদের মিলনের যে সম্ভাবনা ছিল, আপনি তাতে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন এসে!
[বিপ্লবকুমার চমকিত হইয়া উঠিল। সে একবার জয়ন্তের দিকে, একবার স্বাহার দিকে তাকাইয়া দীর্ঘশ্বাস মোচন করিয়া অধোমুখে দাঁড়াইয়া রহিল।]
স্বাহা
:
(ব্যথা-ক্লিষ্ট কন্ঠে) তুমি ভুল করলে জয়ন্ত। এই ভুলের জন্য সারা দেবলোককে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। সারা দেবলোকের যৌবনের মূর্ত প্রতীক তোমরা দু-জন। তোমরাই যদি দ্বিধা-বিভক্ত হও, দেবলোকের কল্যাণ তাহলে পূর্ণ মূর্তি পরিগ্রহ করবে কেমন করে? দেবলোকের কল্যাণের জন্য যদি আমি তোমাদের মাঝ থেকে সরে দাঁড়াই, তাহলে কি তোমরা এক হবে?
বিপ্লবকুমার
:
এ সব হেঁয়ালির মানে তো বুঝতে পারছিনে, স্বাহা দেবী! আমি যা ভেবেছি, তাই যদি সত্য হয় – তাহলে আপনাদের দুইজনকেই বলে রাখি, আমায় দিয়ে আপনাদের কোনো পক্ষেরই কোনো লাভালাভের ভয় বা আশা নেই। আমি স্বদেশ ছাড়া আর কিছুই জানিনে। জয়ন্তদেবকে সাথে পেলে আমার ব্রত সহজে উদ্‌যাপন হত। না পাই, ওঁকে নমস্কার করে চলে যাব। এর মাঝে মান-অভিমানের পালা আসবার তো কথা ছিল না!
জয়ন্ত
:
আপনি আমার নমস্য বিপ্লবকুমার ! আমার নির্লজ্জতা ক্ষমা করুন। আপনার পার্শ্বে দাঁড়াবার মতো সংযম ও শক্তি যদি থাকত, আমি নিজেকে ধন্য মনে করতাম। আমার সে শক্তিই নাই। তাছাড়া, আপনার পথকে শ্রেষ্ঠ পথ বলে গ্রহণ করবার মতো বিশ্বাস অর্জন করতে পারিনি আজও। আপনার মন্ত্রে অবিশ্বাসী আপনার পথে শুধু বাধারই সৃজন করবে – পথকে এগিয়ে দিতে পারবে না।
বিপ্লবকুমার
:
আপনার শক্তির উপর আপনার চেয়ে আমার বেশি বিশ্বাস আছে, জয়ন্ত দেব। কিম্তু সে শক্তিকে যখন আপনি দেশের বড়ো কল্যাণের জন্য দান করতে কার্পণ্য করছেন, তখন সেখানে আমার বলার কিছু নেই। আমার শুধু একটি প্রশ্ন মনে রাখবেন – এবং পারেন তো পরে উত্তরও পাঠাবেন। সে প্রশ্নটি এই যে, দেবলোকের যৌবন আজও শুধু অতীতের দাসত্বই করবে, না সে তার নিজের পথ নিজে রচনা করবে? সোজা পথ দুরূহ বিপদ-সংকুল বলেই কি তাকে ছেড়ে এক বছরের লক্ষ্যস্থলে একশো বছরে পৌঁছুতে হবে? চললাম – স্বাহা দেবী, নমস্কার! আপনার এখন জয়ন্তদেবের সাহায্য করাই উচিত।
স্বাহা
:
এখন আপনার পিছনে চলা ছাড়া তো আর আমার অন্য পথ নাই, বিপ্লবকুমার। যিনি আমাকে বুঝতেই পারেননি, তাঁর পথের বোঝা হয়ে থেকে কোনো লাভ নেই!
জয়ন্ত
:
নমস্কার! (উভয়কে নমস্কার করিলেন)।
বিপ্লবকুমার
:
তাহলে আমার পশ্চাতেই আসুন। শক্তিকে ফিরিয়ে দিতে নাই।
ভূতের ভয় সূচী
আপনার জন্য প্রস্তাবিত
ভালো লাগা জানান
Scroll Up