এযাবৎ 49 টি গ্রন্থ সংযোজিত হয়েছে।
[গভীর পার্বত্য অরণ্য। সেই অরণ্যে রক্ত-বাস-পরিহিত যোদ্ধৃবেশে বিপ্লবী দেবযুবাদল ও বিপ্লব-কুমার। পর্বতের সানুদেশে পর্বত ঘিরিয়া ভূতের শত শত কালো তাম্বু। পর্বত-শিখর অন্ধকার করিয়া কৃষ্ণ শকুনের মতো দলে দলে ভূতের রথ উড়িয়া ফিরিতেছে।]
বিপ্লবকুমার
:
বীর দেব-সেনাদল আজ আমাদের শেষ ভাগ্যপরীক্ষা। ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন, এমন দুরাশা করিনে। তবু যাবার আগে ভূতের নখর দন্ত গুলো নিঃশেষ করে দিয়ে যেতে চাই। দেবলোককে তাদের শক্তি সম্বন্ধে সচেতন করে দিয়ে যেতে চাই – আমাদের এই মুষ্টিমেয় দেবযুবার আত্মবলিদানে। কত বড় বিপুল শক্তি শুধু আত্মশক্তির অ-পরিচয়ে, আত্ম-চেতনার অভাবে নিষ্ক্রিয় নির্বীর্য হয়ে দিনের পর দিন ক্লিষ্ট পিষ্ট পদদলিত হচ্ছে–শুধু সেইটুকু জানিয়ে যেতে পারলেই বুঝব – আমরা আমাদের কর্তব্য করেছি। বাকি কাজ দেবলোকের অনাগত যুবারা স্বল্পায়াসেই করতে পারবে।
দেব-সেনাদল
:
জয় শিব শংকর! জয় দেবলোকের জয়!
[গান করিতে করিতে দেবযুবাদলের অগ্রগমন]
বজ্র আলোকে মৃত্যুর সাথে
হবে নব পরিচয়!
জয় জীবনের জয়॥
শক্তিহীনের বক্ষে জাগাব
শক্তির বিস্ময়।
জয় জীবনের জয়॥
ডঙ্কা বাজায়ে শঙ্কা-হরণে
আনিব সমরে অমর মরণে,
কণ্টক-ক্ষত নগ্ন চরণে
দলিব মৃত্যু-ভয়।
জয় জীবনের জয়॥
মরু-অরণ্য গিরি-পর্বতে রচিব রক্ত-পথ,
সেই পথ ধরি ভবিষ্যতের আসিবে বিজয়-রথ।
আমাদের শত শব-চিন ধরি
আসিবে শক্তি প্রলয়ংকরী,
আসিবে মোদের রক্ত সাঁতারি
নবীন অভ্যুদয়
জয় জীবনের জয়॥

বিপ্লবকুমার
:
সাবাস জোয়ান! এইবার হানো বজ্র, হানো ত্রিশূল, হানো পরশু – ওই ভূতের বাথান লক্ষ্য করে।
[দেব-যুবাগণ অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে লাগিল। ঊর্ধ্ব অধঃ, সম্মুখ, পশ্চাত– সকল দিক দিয়া পশু-মুখ ভূতের দল অলক্ষ্য অস্ত্র হানিতে লাগিল।]
দেব-যুবাগণ
:
সেনাপতি! আমাদের অস্ত্র নিঃশেষ হয়ে গেছে।
বিপ্লবকুমার
:
(যুদ্ধ করিতে করিতে) শুধু হাতে-পায়ে যুদ্ধ করো। হত আহত সৈনিকের হাত ছিঁড়ে নিয়ে তাই দিয়ে আক্রমণ করো। মনে রেখ বন্ধু আমরা কেউ ফিরে যাবার জন্য আসিনি!
[দেব-যুবাগণ শুধু হাতে ভূতেদের উপর লাফাইয়া পড়িল। হত-আহত সৈনিকের হাত-পা ছিঁড়িয়া লইয়া আঘাত হানিতে লাগিল। ভূতের তাম্বুতে ভীষণ সন্ত্রাস। কিচিরমিচির শব্দ উত্থিত হইল। ভূতের সিংহমুখ সেনাপতির ইঙ্গিতে ভূতেরা ঊর্ধ্ব হইতে এক অদৃশ্য মায়াজাল নিক্ষেপ করিল। দেবযুবাগণ সেই জালের প্রভাবে শক্তিহীন হইয়া বদ্ধহস্ত-পদ অবস্থায় দাঁড়াইয়া রহিল। শত ইচ্ছা সত্ত্বেও কেহ এক পদও অগ্রসর হইতে পারিল না। ভূতেরা একে একে সকলকে বন্দি করিল।]
বিপ্লবকুমার
:
শংকরী! রাক্ষুসি! এতেও তোর ক্ষুধার নিবৃত্তি হল না? তোর বিজয়া দশমী কি চিরকালের জন্য হয়ে গেছে? আমার সেনাদল গেছে। আমি এখনও বেঁচে আছি। ওদের মায়াজালের বন্ধনকে অতিক্রম করে বাঁচার শক্তি আজও আমি হারাইনি। উঃ! পশ্চাৎ হতে আমায় আক্রমণ করেছে।
[কৃষ্ণবাস-পরিহিত একদল ভূত বিপ্লবকুমারকে ভীষণ আক্রমণ করিল। বিপ্লবকুমার পড়িয়া গেল।]
স্বাহা
:
ভয় নাই বীর, আমি আসছি। ওই দেখো পশ্চাতে আমার নারী-সেনাদল! ও মায়াবী ভূতের মায়াজাল ছিন্ন করতে পারবে – এই মায়াবিনী নারী-সেনা! ওদের অস্ত্র ব্যর্থ করতে পারব আমরাই।
বিপ্লবকুমার
:
না দেবী, পারবে না। তুমি ভুলে যাচ্ছ, এ দেবতায় দেবতায় যুদ্ধ নয়। দেবতায় পশুতে যুদ্ধ এ। রক্ত-খেগো পশু আর রাক্ষস পুরুষ-নারীর সমানে রক্ত শোষণ করে। ওদের শক্তিকে ভয় করি না, ভয় করি ওদের উলঙ্গ নির্লজ্জতাকে। ওরা তোমাদের – আমাদের দেবলোকের প্রাণশক্তির অবমাননা করে যদি তার খর্বতা সাধন করে – আমাদের দেবলোক কোনো দিনই ভূতের গ্রাস থেকে মুক্ত হবে না। তুমি ফিরে যাও। তোমার কাজ আমার এই হারাপথের সন্ধানী যুবকদের খুঁজে বের করা। তাদের এই মৃত্যু পথের সন্ধান দেওয়া। আমরা আত্মদান করে ভয়-মুক্ত করে গেলাম জাতিকে, মৃত্যুঞ্জয় কবচ বেঁধে দিলাম দেবলোকের যুবশক্তির বাহুতে। এর পরে যারা আসবে এই পথে তারাই আমাদের শবের কঙ্কাল ধরে ধরে আমাদের আহতদের রক্ত-চিহ্ন অনুসরণ করে যাবে আমাদের উদ্ধার সাধনে। ভূতের হাত থেকে অমৃতের উদ্ধার করে আমাদের বাঁচিয়ে তুলবে। সেইদিন আসব আমরা নতুন দেহে – নতুন রূপে। ধ্বংসের পূজারী-দল আসব নব-সৃষ্টির ধেয়ানী হয়ে! স্বাহা! আমি যাই। উঃ!
স্বাহা
:
(বিপ্লবকুমারের উপর পড়িয়া) বন্ধু! প্রিয়! তোমার শেষ দান আমায় দিয়ে যাও।
বিপ্লবকুমার
:
আমার শেষ দান – আমার শক্তি তোমায় দিয়ে গেলাম। তারপর যা চাও, সে প্রীতি সে প্রেম – পাবে যখন আবার আমি আসব। সে আজ না, স্বাহা!
স্বাহা
:
(উঠিয়া পদধূলি লইয়া) তুমি শান্তিতে যাও বীর, আমি তোমার ব্রত গ্রহণ করলাম।
[ বিপ্লবকুমার স্বাহার দক্ষিণ কর ললাটে ঠেকাইয়া চক্ষু মুদ্রিত করিল।]
যবনিকা
আপনার জন্য প্রস্তাবিত
Scroll Up