এযাবৎ 45 টি গ্রন্থ সংযোজিত হয়েছে।
‘প্রলয়-শিখা’ প্রথম সংস্করণ ১৩৩৭ সালে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় সংস্করণের প্রকাশক মৌলভী মঈনউদদীন হোসয়ন তাঁহার ‘নিবেদন’-এ প্রসঙ্গত: বলিয়াছেন: ‘কবি নজরুল নিজের নামে ও নিজের দায়িত্বে ‘প্রলয়-শিখা’ প্রকাশ করিলেন, অর্থাৎ নিজেই প্রকাশক ও মুদ্রাকর হইলেন।‘ তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার বহি খানি বাজেয়াফত করেন। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১২ই চৈত্র মুতাবিক ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে মার্চ তারিখের সাপ্তাহিক ‘আহলে হাদিস’ পত্রিকায় কবি নজরুল ইসলামের রাজদ্রোহ-অভিযোগ হইতে মুক্তি শীর্ষক সংবাদে বলা হয়:

‘… প্রলয়-শিখা’ নামক এক কবিতা-পুস্তক প্রকাশ করিয়া রাজদ্রোহ অপরাধ করার সুপ্রসিদ্ধ কবি নজরুল ইসলাম প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ৬-মাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিলেন। অতঃপর তিনি হাইকোর্টে আপিল করায় জামিন-মুচলেকায় মুক্ত ছিলেন। গান্ধী-আরউইন-চুক্তির পর সরকারপক্ষ আপত্তি না করায় তাহাকে অব্যাহতি দেওয়া হইয়াছে।‘

‘প্রলয়-শিখা প্রথম সংস্করণের পরিবেশক বর্মণ পাবলিশিং হাউসের স্বত্বাধিকারী পরলোকগত ব্ৰজবিহারী বর্মণ ১৩৬৫ শ্রাবণ-আশ্বিনের ‘ফসল’ পত্রিকায় লিখেন:

’১৯৩০ সালে কাজী নজরুল ইসলামের প্রলয়-শিখা’ নামে একটি কবিতার বই প্রকাশ করি। ইচ্ছাকৃতভাবেই, গরম গরম কবিতা তাতে রাখা হয়। রাজদ্রোহের ভয়ে যেসব কবিতা পূর্বে কোন বইয়ে দেওয়া হয়নি, সেগুলি এবং কয়েকটি নয়া কবিতাও এতে সংযোজিত হয়। বর্তমান প্রকাশিত বইয়ে সেগুলোর সব নেই।‘

১৩৩৬ সালে, ভাদ্রের ‘ছাত্র’ পত্রিকায় নমস্কার’, আশ্বিনের সওগাতে ‘হবে জয়’, সাপ্তাহিক জাগরণে ‘পূজা-অভিনয়’ এবং কার্তিক-অগ্রহায়ণের মোয়াজ্জিনে ‘খেয়ালী’ প্রকাশিত হয়।
শ্রীপ্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘কাজী নজরুল’ পুস্তকে লিখিয়াছেন যে, তিনি ১৩৩৫ সালে ‘খেয়ালী’ নামে একটি স্বল্পায়ু মাসিক প্রকাশ করেন এবং কবি তাহারই জন্য আশীর্বাণী-স্বরূপখেয়ালী’ কবিতাটি লিখিয়া দেন।
পুনশ্চ
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ৫০/২ মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট, কলিকাতা থেকে গ্রন্থকার কর্তৃক প্রলয়-শিখা প্রকাশিত হয়। মুদ্রাকর হিসেবেও তাঁর নাম মুদ্রিত হয়। ‘বিধিমতে প্রতিষ্ঠিত শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসন্তোষ উৎপাদন করা হইয়াছে বা তাহার চেষ্টা করা হইয়াছে, এই অভিযোগ ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ বইটি বাজেয়াফত করা হয় এবং রাজদ্রোহের অভিযোগে ৬ নভেম্বর ১৯৩০ কবিকে গ্রেপ্তার করা হয়। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারের সময়ে আসামীপক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, নজরুল ইসলাম উক্ত গ্রন্থের লেখক হলেও প্রকাশক বা মুদ্রাকর নন এবং তিনি কাউকে বইটি প্রকাশ বা মুদ্রণ করতে দেন নি। ব্রজবিহারী বর্মণও বইটি প্রকাশ ও মুদ্রণের দায়িত্ব স্বীকার করেন নি। সরকারপক্ষ বলেন যে, পুস্তকটি গ্রন্থকারের অজ্ঞাতে প্রকাশিত হয়নি, তিনি বর্মণ পাবলিশিং প্রেসে প্রকাশের জন্য লেখাগুলি দিয়েছিলেন, ওই প্রকাশকের কাছ থেকে আংশিকভাবে টাকা পেয়েছিলেন এবং মুদ্রিত বইয়ের এক শ কপি গ্রহণ করেছিলেন। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৩০ তারিখে প্রলয়-শিখা গ্রন্থের ‘নবভারতের হলদিঘাট’, ‘যতীন দাস’ ও ‘জাগরণ’ কবিতা তিনটি আপত্তিকর বিবেচিত হওয়ায় বিচারক কবিকে ছ-মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হয়। কবি পূর্বাপর জামিনে মুক্ত ছিলেন। গান্ধী-আরউইন চুক্তির পরে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে তাঁকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
‘নব-ভারতের হলদিঘাট’ কবিতাটি রচিত হয় বিপ্লবী যতীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় বা বাঘা যতীনের (১৮৭৯-১৯১৫) স্মরণে। ১৯০৩ সালে তিনি অরবিন্দ ঘোষ ও যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রেরণায় বিপ্লবী দলে যোগ দেন এবং পরে যুগান্তর সমিতির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হবার পরে তাঁর দল পরিকল্পনা করে যে একটি জার্মান জাহাজ থেকে অস্ত্র নিয়ে বালেশ্বর রেললাইন অধিকার করে ইংরেজ সৈন্যদের কলকাতা যাবার পথ রুদ্ধ করা হবে। পুলিশ তা জানতে পেরে যতীন্দ্রনাথ ও তাঁর চারজন সঙ্গীকে ঘিরে ফেলে। যতীন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গীরা ট্রেঞ্চ খুঁড়ে সম্মুখযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। একজন ঘটনাস্থলে নিহত হন এবং গুরুতরভাবে আহত যতীন্দ্রনাথ পরদিন বালেশ্বর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে দুজনের ফাঁসি ও অপরজনের ১৪ বছর কারাদণ্ড হয়। কারাদণ্ড ভোগকালে পুলিশের অত্যাচারে উন্মাদ হয়ে ১৯২৪ সালে ইনি মারা যান।
হলদিঘাটের যুদ্ধে (১৫৭৬) মুঘল সেনাপতি মানসিংহ মেবারের রানা প্রতাপসিংহকে পরাজিত করেছিলেন। পরে প্রতাপসিংহ হৃত রাজ্য অনেকখানি উদ্ধার করেন।
প্রলয়-শিখায় ‘নব-ভারতের হলদিঘাট’ কবিতাটির পরেই ‘যতীন দাস’ কবিতাটি বিন্যস্ত হওয়ায়, মনে হয়, যতীন্দ্রনাথ দাসের (১৯০৪-২৯) আত্মাহুতিই উভয় কবিতার প্রেরণা জুগিয়েছিল। যতীন দাস অল্প বয়সে বিপ্লবী দলে যোগ দেন এবং তরুণ সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার আসামীরূপে তিনি লাহোর জেলে প্রেরিত হন এবং জেল কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে অনশন করেন। তাঁকে জোর করে খাওয়ার চেষ্টা করলে অভ্যন্তরীণ শারীরিকাঘাতে ৬৩ দিন অনশনের পর তাঁর মৃত্যু হয়। যতীন দাসের মৃতদেহ কলকাতায় আনা হলে বিশাল মিছিল তাঁর শবানুগমন করে। প্রথম বর্ষ অষ্টম সংখ্যা ধুমকেতুতে (১২ সেপ্টেম্বর ১৯২২) যতীন দাসের মৃত্যুসংবাদ ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকাশিত হয়।
অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সমকালে নজরুল (ঢাকা, ১৯৮৩, পৃ. ২১৬) গ্রন্থে সংকলিত ১৩৫২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যা সওগাতের সাময়িকী শীর্ষক রচনার নিম্নলিখিত অংশ এ প্রসঙ্গে উদ্ধতিযোগ্য:

…আমরা জানিয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলাম যে, গভর্ণমেন্ট সম্প্রতি বই দুখানার [বিষের বাঁশী ও প্রলয়-শিখা] উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিয়াছেন। তবে ‘প্রলয়-শিখা’ সম্বন্ধে এই শর্ত দেওয়া হইয়াছে যে, ‘নব ভারতের হলদিঘাট’, ‘যতীন দাস’ ও ‘জাগরণ’-এই তিনটি কবিতা বাদ দিয়া বইখানা ছাপিতে হইবে। এটা ‘সর্বনাশের অর্ধেক ভালোর মতো ব্যাপার। ঐ তিনটি কবিতা যাঁরা কখনো পড়িয়াছেন, তাঁহারাই বুঝিবেন যে, ঐগুলি বাদ দিয়া ছাপিলে প্রলয়-শিখার মূল্য খুবই কমিয়া যাইবে। আমাদের মনে হয়, গভর্ণমেন্ট যখন গোটা বইটাকেই তাঁদের আইনের বেড়াজাল হইতে মুক্তি দিলেন, তখন ঐ তিনটি কবিতা নিয়াও তাঁরা অতঃপর মাথা না ঘামাইলে পারিতেন।…

প্রলয়-শিখার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৫৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্রে (আগস্ট ১৯৪৯)। প্রকাশক : মঈনউদ্দীন হোসায়ন, বি.এ., নুর লাইব্রেরি, ১২/১ সারেঙ্গ লেন, কলিকাতা। পৃ৫০+৮+পরিশিষ্ট; মূল্য আড়াই টাকা। এই সংস্করণে ‘নব-ভারতের হলদিঘাট’ ও ‘যতীন দাস’ কবিতাটি মুদ্রিত হলেও ‘জাগরণ’ স্থান পায় নি। নজরুল রচনাবলীতে এই সংস্কৃরণের পাঠই অনুসৃত হয়েছে।
আপনার জন্য প্রস্তাবিত
Scroll Up