এযাবৎ 50 টি গ্রন্থ সংযোজিত হয়েছে।
[সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়ামের ভূমিকা এখানে নজরুল ইসলাম ও ওমর খৈয়াম শিরোনামে সম্পূর্ণ প্রকাশিত হলো।]

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, রাজমহল, শ্রীরামপুর, হুগলি এবং পরবর্তী যুগে কলকাতায় অনেকখানি আরবি-ফার্সির চর্চা হয়েছিল বটে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এ চর্চা খুব ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। তার প্রধান কারণ অতি সরল—ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে পূর্ববাংলার মত ছড়িয়ে পড়তে পারেনি, কাজেই অতি সহজেই অনুমান করা যায়, চুরুলিয়া অঞ্চলে পীর-দরবেশদের কিঞ্চিৎ সমাগম হয়ে থাকলেও মৌলবি-মৌলানারা সেখানে আরবি-ফার্সির বড় কেন্দ্র স্থাপন করতে পারেননি।
তদুপরি নজরুল ইসলাম ইস্কুলে সুবোধ বালকের মত যে খুব বেশি আরবি-ফার্সি চর্চা করেছিলেন তাও মনে হয় না। ইস্কুলে তিনি আদৌ ফার্সি (আরবি সম্ভাবনা নগণ্য) অধ্যয়ন করেছিলেন কি-না, সে সম্বন্ধেও আমরা বিশেষ কিছু জানিনে। শ্রীযুক্ত শৈলজানন্দ নিশ্চয়ই অনেক কিছু বলতে পারবেন।
তারো পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেওয়ার ফলে তিনি যে এ সব ভাষায় খুব বেশি এগিয়ে গিয়েছিলেন তাও তো মনে হয় না। পল্টনের হাবিলদার যে জাব্বা-জোব্বা পরে দেওয়ানা-দেওয়ানা ভাব ধরে হাফিজ-সাদীর কাব্য কিম্বা মৌলানা রুমীর মসনবী সামনে নিয়ে কুঞ্জে কুঞ্জে ছন্নছাড়ার মত ঘুরে বেড়াবে তাও তো মনে হয় না। এমন কি রঙিন সদরিয়ার উপর মলমলের বুটিদার পরে হাতে শিরাজীর পাত্র নিয়ে সাকির কণ্ঠে ফার্সি গজল আর কসীদা-গীত শুনছেন, এও খুব সম্ভবপর বলে মনে হয় না। কসম খেয়ে এ বিষয়ে কোনো কিছু বলা শক্ত, তবে এটা তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, কাব্যে যদ্যপি ‘খাকী’ এবং ‘সাকী’র চমৎকার মিল, তবু বাস্তব জীবনে এদুটোর মিল এবং মিলন সচরাচর হয় না।
তবু নজরুল ইসলাম মুসলিম ভদ্রঘরের সন্তান। ছেলেবেলায় নিশ্চয়ই কিঞ্চিৎ আলিফ, বে, তে করেছেন, দোয়-দরুদ (মন্ত্র-তন্ত্র) মুখস্থ করেছেন, কুরান পড়াটা রপ্ত করেছেন। পরবর্তী যুগে তিনি কুরানের শেষ অনুচ্ছেদ ‘আমপারা’ বাঙলা ছন্দে অনুবাদ করেন—হালে সেটি প্রকাশিত হয়েছে। সে পুস্তিকাতে তাঁর গভীর আরবি জ্ঞান ধরা পড়ে না—ধরা পড়ে তাঁর কবিজনোচিত অন্তর্দৃষ্টি এবং আমপারার সঙ্গে তাঁর যে আবাল্য পরিচয়। বিশেষ করে ধরা পড়ে, দরদ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার বাণী (আল্লার ‘কালাম) হৃদয়ঙ্গম করার তীক্ষ্ণ এবং সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা।
এরই উপর আমি বিশেষ করে জোর দিতে চাই। ফার্সি তিনি বহু মোল্লামৌলবির চেয়ে কম জানতেন, কিন্তু ফার্সি কাব্যের রসাস্বাদন তিনি করেছেন তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই অনেক সংস্কৃত ব্যাকরণবাগীশদের চেয়ে কম সংস্কৃত জানতেন, কিন্তু তিনি লিরিকের রাজা মেঘদূতখানা জীবন এবং কাব্য দিয়ে যতখানি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন ততখানি কি কোনো পণ্ডিত পেরেছেন? বহু লোকই বাঙলাদেশের মাটি নিখুঁতভাবে জরিপ করেছেন, কিন্তু ঐ মাটির জন্য প্রাণ তো তারা দেয়নি। কানাইলাল ভালো জরিপ জানতেন একথাও তো কখনো শুনিনি।
কাজী রোমান্টিক কবি। বাঙলাদেশের জল বাতাস, বাঁশ-ঘাস যে রকম তাঁকে বাস্তব থেকে স্বপ্নলোকে নিয়ে যেত, ঠিক তেমনি ইরান-তুরানের স্বপ্নভূমিকে তিনি বাস্তবে রূপান্তয়িত করতে চেয়েছিলেন বাঙলা কাব্যে। ইরানে তিনি কখনো যাননি, সুযোগ পেলেই যে যেতেন, সে কথাও নিঃসংশয়ে বলা যায় না (শুনেছি, পণ্ডিত হয়েও মাক্সম্যুলার ভারতবর্ষকে ভালবাসতেন এবং তাই বহুবার সুযোগ পেয়েও এদেশে আসতে রাজি হননি।) কিন্তু ইরানের গুল-বুলবুল, শিরাজী-সাকি তাঁর চতুর্দিকে এমনই কি জানা-অজানার ভুবন সৃষ্টি করে রেখেছিল যে গাইডবুক, টাইম-টেবিল ছাড়াও তিনি তার সর্বত্র অনায়াসে বিচরণ করতে পারতেন। গুণীরা বলেন, প্রত্যেক মানুষেরই দুটি করে মাতৃভূমি—একটি তাঁর আপন জন্মভূমি ও দ্বিতীয়টি ফ্রান্স। কাজীর বেলা বাঙলা ও ইরান। কীটস বায়রনের বেলা যে রকম ইংল্যাণ্ড ও গ্রীস।
আরব ভূমির সঙ্গে কাজী সায়েবের যেটুকু পরিচয়, সেটুকু প্রধানত ইরানের মারফতেই। কুরান শরীফের ‘হারানো ইউসুফের’ যে করুণ কাহিনী বহু মুসলিম অমুসলিমের চোখের জল টেনে এনেছে তিনি কবিরূপে তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন ফার্সি কাব্যের মারফতে।
দুঃখ করো না, হারানো, য়ুসুফ
কানানে আবার আসিবে ফিরে।
দলিত শুষ্ক এ মরু পুন
হয়ে গুলিস্তা হাসিবে ধীরে।।
ইউসুফে গুম্‌গশ্‌তে বা’জ্‌ আয়দ্‌ বকিনান্‌
গম্ ম্-খুর।
কুল্‌বয়ে ইহ্‌জান্‌ শওদ্‌ রূজী গুলিস্তান্
গম্‌-ম্‌-খূর।।
কাজী সায়েবের প্রথম যৌবনের রচনা এই ফার্সি কবিতাটির বাঙলা অনুবাদ অনেকেরই মনে থাকতে পারে। ‘মেবার পাহাড়, মেবার পাহাড়ের’ অনুকরণে ‘শাতিল আরব শাতিল আরব’ ঐ যুগেরই অনুবাদ।
কোনো কোনো মুসলমান তখন মনে মনে উল্লসিত হয়েছেন এই ভেবে যে, কাজী ‘বিদ্রোহী’ লিখুন আর যা-ই করুন, ভিতরে ভিতরে তিনি খাঁটি মুসলমান। কোনো কোনো হিন্দুর মনেও ভয় হয়েছিল (যাঁরা তাঁকে অন্তরঙ্গভাবে চিনতেন তাঁদের কথা হচ্ছে না) যে, কাজীর হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি বোধ হয় বাঙলার জন্য নয়—তাঁর দরদ বুঝি ইরান-তুরানের জন্য। পরবর্তী যুগে—পরবর্তী যুগে কেন, ঐ সময়ের কবিকে যাঁরা ভালো করে চিনতেন, তাঁরাই জানতেন, ইরানি সাকির গলায় কবি যে বার বার শিউলির মালা পরিয়ে দিচ্ছেন তার কারণ সে তরুণী মুসলমানী বলে নয়, সে সুন্দরী ইরানের বিদ্রোহী কবিদের নর্ম সহচরী বলে—ইরানের বিদ্রোহী আত্মা কাব্যরূপে, মধুররূপে তার চরম প্রকাশ পেয়েছে সাকির কম্পনায়।
সে বিদ্রোহ কিসের বিরুদ্ধে?
এ স্থলে কিঞ্চিৎ ইতিহাস আলোচনার প্রয়োজন।
ইরানি ও ভারতীয় একই আর্যগোষ্ঠীর দুই শাখা। দুই জাতির ইতিহাসেই অনেকখানি মিল দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু ইরানিরা যে রকম দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে একদিকে মিশর প্যালেস্টাইন, অন্য দিকে গ্রীস পর্যন্ত হানা দিয়েছিল, ভারতীয়েরা সে রকম করেনি। দ্বিতীয়ত বিদেশী অভিযানের ফলে ইরানভূমি যে রকম একাধিকবার সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড হয়েছে, ভারতবর্ষের ভাগ্যে তা কখনো ঘটেনি। এ সব কারণেই হোক বা অন্য যে-কোনো কারণেই হোক, ইরানিরা সভ্যতার প্রথম যুগ থেকেই এক উগ্র স্বাজাত্যাভিমানের সৃষ্টি করে। ভারতবর্ষ যেখানে শান্তভাবে বিদেশীর ভালো-মন্দ দেখে-চিনে নিজকে মেলাবার, পরকে আপন করার চেষ্টা করেছে; ইরান সেখানে আদৌ সে চেষ্টা করেনি এবং শেষটায় যখন বাধ্য হয়ে সব কিছু নিতে হয়েছে তখন করেছে পরবর্তীকালে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
গ্রীস-রোমের কাছে পরাজিত হওয়া এক কথা, আর প্রতিবেশী ‘অনুন্নত’, ‘অর্ধসভ্য’ আরবদের কাছে পরাজিত হওয়া আরেক কথা। তদুপরি গ্রীক রোমানরা ইরানে যে সভ্যতা এনেছিল, তাতে গরিব-দুঃখীর জন্য নূতন কোনো আশার বাণী ছিল না। যে নবীন ধন-বণ্টন পদ্ধতি দ্বারা হজরৎ মুহম্মদ আরব দেশের আপামর জনসাধারণকে ঐক্যসূত্রে গ্রন্থন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁর বাণী এসে পৌছল ইরানে। ফলে মুহম্মদ সাহেবের পরবর্তিগণ যখন একদিন অন্যান্য জাতির মত দিগ্বিজয়ে বেরোল তখন ইরানি শোষক সম্প্রদায় দেখে মর্মাহত ও স্তম্ভিত হল যে, ইরানের জনসাধারণ আরবের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হল না। তারপর আরবরা বিজিত দেশের ধর্মজগতে যে সাম্যবাদ ও অর্থের ক্ষেত্রে যে ধনবণ্টন পদ্ধতি প্রচার করলো, তাতে আকৃষ্ট হয়ে ইরানের জনসাধারণ মুসলমান হয়ে গেল। জ্ঞানাভিমানী ও ধর্মযাজক সম্প্রদায়ও শেষ পর্যন্ত ঐ ধর্ম গ্রহণ করল। তখনকার মত ইরানি সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রায় লোপ পেয়ে গেল।
কিন্তু বিদ্রোহ লুপ্ত হল না।
সেটা দেখা দিল প্রায় চারশ বছর পরে ফিরদৌসীর মহাকাব্য ‘শাহনামা’তে। রাষ্ট্রভাষা আরবিকে উপেক্ষা করে ফিরদোসী গাইলেন প্রাক-মুসলিম যুগের ইরানি বীরের কাহিনী, রাজার দিগ্বিজয়, প্রেমিকের বিরহ-মিলন গাথা—নবীন অথচ সনাতন সেই ফার্সি ভাষায়। সে ফার্সি কাব্য-সাহিত্য পরবর্তী যুগে বিশ্বজনের বিস্ময় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তার প্রথম সার্থক কবি ফিরদৌসী।
এই নূতন ভাষাতে, নবীন প্রাণে উন্মত্ত হয়ে যেসব কবি কাব্যের সর্ব বিষয়বস্তু নিয়ে নব নব কাব্যধারার প্রবর্তন করলেন তার কাছে পরবর্তী যুগের ইউরোপীয় রেনেসাঁসও এতখানি সর্বমুখী বলে মনে হয় না। দুশ বছর যেতে না যেতেই বিশ্বের কাব্যজগতে ইরান তার অদ্বিতীয় আসন সৃষ্টি করে নিল।
এঁদের মধ্যে সত্য বিদ্রোহী কবি ওমর খৈয়াম।
****
ইরানে ইসলাম প্রচারিত হওয়ার ফলে শিক্ষিত তথা পুরোহিত সম্প্রদায়ের ভিতর বিভিন্ন আন্দোলনের সৃষ্টি হল। তার প্রথম—
(১) যাঁরা মুসলিম শাস্ত্রের চর্চা করে যশস্বী হলেন। ভাবলে আশ্চর্য বোধ হয়, ইরানিরা আরবির মত কঠিন ভাষা আয়ত্ত করে সে শাস্ত্রে এতখানি ব্যুৎপত্তি অর্জন করলো কি করে? মুসলমানদের মনুর নাম ইমাম আবু হানীফা। পৃথিবীর শতকরা আশি জনেরও বেশি মুসলমান আজ নিজকে হানফী অর্থাৎ আবু হানীফার মতবাদে বিশ্বাসকারী বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু তাতে আশ্চর্য হবার মত কীই বা আছে? শ্ৰীশ্ৰীশঙ্করাচার্য তো শুনেছি ভারতবর্ষের দক্ষিণতম কোণের লোক, এবং তাঁর ধমনীতে যে অত্যধিক আর্যরক্ত ছিল তাও তো মনে হয় না, অন্তত একথা তো অনায়াসে বলা যেতে পারে যে, আর্য উত্তর ভারতের তুলনায় মালাবারে সংস্কৃত চর্চা ছিল অনেক কম। তবু যে তিনি শুধু তাঁর মাতৃভূমি মালাবারে বৌদ্ধদের পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাই নয়, আর্য উত্তর ভারতেও তিনি তাঁর বিজয় পতাকা উড্ডীয়মান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইরানি আবু হানীফার মতবাদও একদা ইসলামের জন্মভূমি মক্কা-মদীনা তথা আরব দেশ জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। এ রকম উদাহরণ পৃথিবীতে আরো আছে।
(২) যাঁরা ক্রিয়াকাণ্ড, টীকা-টীপ্‌পনী, মন্ত্রতন্ত্রে সম্পূর্ণ আস্থা না দিতে পেরে ‘রহস্যবাদ’ বা সূফীতত্ত্বের প্রচার এবং প্রসার করতে লাগলেন। এঁরা ভগবানের আরাধনা করেন রসের মাধ্যমে এবং বাঙলার বৈষ্ণব তথা ‘মরমিয়াদের’ সঙ্গে এঁদের তুলনা করা যেতে পারে।
মরম না জানে
ধরম বাখানে
এমন আছয়ে যারা
কাজ নাই, সখি,
তাঁদের কথায়
বাহিরে থাকেন তাঁরা।
* * *
ঐ চাহনিতে
বিশ্ব মজেছে
পড়িয়াছে কত অশ্রুধার
পাগল করিল
এ প্রমত্ত আঁখি
কুলমান রাখা হৈল ভার।
এ ধরনের কবিতা সুফী ও বৈষ্ণবদের ভিতর এতই প্রচলিত যে, কোনটি সুফী কোনটা বৈষ্ণব ধরে ওঠা অসম্ভব। যদি বলি,
প্রেম নাই, প্রিয় লাভ আশা করি মনে
রাধিকার মৃত ভ্রান্ত কে ভব-ভবনে।
তবে চট করে কেউ আপত্তি করবেন না। অথচ আসলে আছে,
প্রেম নাই, প্রিয় লাভ আশা করি মনে,
হাফেজের মত ভ্রান্ত কে ভবনে।
(‘সদ্ভাব-শতক’ কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের অনুবাদ)
বৈষ্ণবদের সঙ্গে এঁদের আরো বহু মিল আছে। এঁদের সুফীবাদ পরবর্তী যুগে তথাকথিত ‘তুকি’রা গ্রহণ করে। বাঙলাদেশে প্রথম যে মুসলমানরা আসেন তাঁদের আমরা ‘তুর্ক’, ‘তুরুক’, নাম দি (প্রাচীন বাঙলার ‘মুসুলমান’ শব্দের প্রতিশব্দ ‘তুর্ক’— অমিল এখনো ‘তুরস্কম’) এবং তাঁদের চক্রাকারে নৃত্য করে আল্লার নাম জপ (‘জিকর’—যার থেকে বাঙলা ‘জিগির’ শব্দ এসেছে) করা দেখে ‘তুর্কি নাচন-নাচা’ প্রবাদটি এসেছে। বৈষ্ণবদের মত এঁরাও জপ করতে করতে ‘হাল’ (দশা) প্রাপ্ত হন,—অর্থাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন ও মুখ দিয়ে এখন প্রচুর ফেনা বেরয়। পূর্ব ইয়োরোপে এই নাচ দেখেই ইয়োরোপীয়রা এদের নাম দিয়েছিল ‘ডানসিং দরবেশ’। ইংরিজিতে কথাটা এখনো চালু আছে। কিন্তু এ সম্বন্ধে অত্যধিক বাগাড়ম্বর নিষ্প্রয়োজন, কারণ আউল বাউল, ভাটিয়ালি-মুর্শীদীয়া গীত যাঁরাই শুনেছেন, তাঁরাই এই ফার্সি, সুফী, ভক্তিবাদের কিঞ্চিৎ গন্ধস্পর্শ পেয়েছেন।
(৩) দার্শনিক সম্প্রদায়। আর্যোগোষ্ঠীর দুই সম্প্রদায়—ভারতীয় ও গ্রীকরাই প্রধানত দর্শনের চর্চা করেছেন।
মাহমুদ বাদশার সভাপণ্ডিত ‘ভারতবর্ষ’ পুস্তকের (প্রাচীন তথা অর্ধার্বাচীন ভারতের বহুমুখী কার্যকলাপ, চিন্তা অনুভূতির সঙ্গে যাঁরা পরিচিত হতে চান তাঁদের পক্ষে এ পুস্তক অপরিহার্য; বস্তুত বর্তমান লেখক ব্যক্তিগতভারে এ পুস্তককে মহাভারতের পরেই স্থান দেয়) লেখক পণ্ডিত অল-বীরূনী মুক্তকণ্ঠে বলেছেন, ‘দর্শনের চর্চা করেছেন গ্রীক এবং ভারতীয়েরা—আমরা (অর্থাৎ আরবি লেখকেরা) যেটুকু দর্শন শিখেছি তা এঁদের কাছ থেকেই।‘ কথাটা মোটামুটি সত্য, যদিও পণ্ডিতসুলভ কিঞ্চিৎ বিনয় প্রকাশ এতে রয়েছে, কারণ আরবরা গ্রীক দর্শনের আরবি অনুবাদ দিয়ে দর্শন চর্চা আরম্ভ করেছিলেন সত্য কিন্তু পরবর্তী যুগে আভিচেন্না (বু আলী সিনা), আভেরস (ইবন-ই-রুশ্‌দ) ও গজ্‌জালী (অল-গাজেল—এঁর সৌভাগ্যস্পর্শমণি প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে বাঙলায় অনূদিত হয়ে রাজশাহীতে প্রকাশিত হয়) বহু মৌলিক চিন্তা দ্বারা পৃথিবীর দর্শন ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু স্মরণ রাখা ভালো, এঁদের দর্শন শঙ্কর-দর্শনেরই ন্যায় ধর্মাশ্রিত এবং যে স্থলে কুরানের বাণীর সঙ্গে গ্রীক দর্শনের দ্বন্দ্ব বেঁধেছে সেখানে তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সে-দ্বন্দ্বের সমাধান করার এবং সময়ে সময়ে তখন তাঁরা নিও-প্লাতোনিজম অর্থাৎ ভারতের উপনিষদ-সম্মত অন্তদৃষ্টির উপর নির্ভর করেছেন। এঁদের বিশেষ নাম ‘মুতকল্লিমুন’ এবং পরবর্তী যুগে এদেশের রাজা রামমোহন তাঁর বিশ্বদর্শন (ভোল্টানশাউউঙ) নির্মাণে এঁদের পরিপূর্ণ সাহায্য নিয়েছেন।
(৪) ঐতিহাসিক ও কবিগোষ্ঠী। ইতিহাসচর্চায় আরবদের দক্ষতা সর্বজনমান্য, তবে ইরানিরাও এ-শাস্ত্র তাঁদের কাছ থেকে শিখে নিয়ে এর অনেক উন্নতি সাধন করেন। কিন্তু আমরা যে যুগের আলোচনা করছি তখনো ইরানিদের কাছে ইতিহাস ও পুরাণের পার্থক্য সুস্পষ্টরূপে ধরা দেয়নি। ফিরদৌসীর ‘শাহনামা’ (রাজবংশ) কাব্যের রাজা-মহারাজা, নায়ক-নায়িকারা অধিকাংশই কবিজনসুলভূ-কল্পনাপ্রসূত—অন্তত তাঁদের কীর্তিকলাপ তো বটেই। কিন্তু সবচেয়ে লক্ষ্য করার বিষয়, প্রাক-ইসলামী এই সব অগ্নি-উপাসক নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে ফিরদৌসীর কী গগনচুম্বী গরিমা, দম্ভ এবং সময় সময় আস্ফালন এ যেন বিজয়ী আরবদের বার বার শুনিয়ে শুনিয়ে বলা, কালনেমির বিরূপাবর্তনে আজ আমাদের পতন ঘটেছে বটে, কিন্তু এই কাব্যে দেখ, আমরা একদিন সভ্যতার কত উচ্চ শিখরে উঠেছিলুম। সে-দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখো। ওখানে তোমরা কখনো, পৌঁছওনি, পৌঁছবেও না।‘ এ সুর কেমন যেন আমাদের চেনাচেনা মনে হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই ইংরেজকে শুনিয়ে শুনিয়ে বারবার এই গান গেয়েছে। (‘অন্য জাতি, দ্বিগ্বসন পরিত যখন। ভারতে ঋগ্বেদ পাঠ হইত তখন।‘ কিন্তু, আফসোস! শাহনামার মত মহাকাব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেনি হেমচন্দ্র ও ইকবালকে ফিরদৌসীর আসনে বসানো কঠিন এবং অন্যান্য কবিরা যে ‘নির্লজ্জতা’ দেখালেন (‘নির্লজ্জতা’ শব্দটি ভেবে চিন্তেই কুটেশনের ভিতর ফেললুম, কারণ কাব্যে রসস্বরূপে প্রকাশ পেলে চরম নির্লজ্জতাও পাঠকের মনে বিদ্রোহ সঞ্চার করতে পারে না। আমাদের দুই মাইডিয়ার হিরো পরননন্দন ভীমসেন ও হনুমান যে সব দম্ভ এবং আস্ফালন করেছেন স্বকর্ণে শুনতে হলে ‘রাম রাম’ বলতে হত, কিন্তু কাব্যে পাঠ করে আনন্দ বিগলিত হয়; মনে হয়, ঐ সময়ে, ঐ অবস্থায় এ বাক্য ছাড়া অন্য কিছুই এঁদের মুখে মানাতো না, কত ইচ্ছে করে, ধন্য ধন্য যুগ কবি যাঁরা দম্ভকে বিনয়ে, লজ্জাকে শ্লাঘায় পরিণত করতে পারেন!’) সেটা ঢাকবার প্রয়াস আজও ইরানে-তুরানে সহজেই চোখে পড়ে। সকলেই জানেন, মুসলমানধর্মে মদ খাওয়া মানা আর সেই মদও যদি খাওয়া হয় তন্বী তরুণী সাকির সঙ্গে—যার সঙ্গে ‘বে-থা’ হয়েছে কিনা সে সম্বন্ধেও কবিরা বড় মারাত্মক স্মৃতিশক্তিহীন—তাও আবার ঝরনা তলায়, নির্জনে, সাঁঝের ঝোঁক, যখন কিনা ‘মগরিবের আইন ওক’তে নামাজ পড়ার কথা, আল্লা-রসুলের নাম স্মরণ করার আদেশ—এবং মনে মনে আওড়ানো,
‘মস্ত, মাতাল-বসনী আমি গো আমি কটাক্ষ বীর’
তা হলে অবস্থাটা কি রকমের হয়?
কথা সত্য, মোল্লারা সুবো-শাম ভালো ভালো কেতাবপুঁথি পড়েন, কিন্তু মাঝে-মধ্যে, নিতান্ত কালে-কম্মিনে দুএকখানা কাব্যগ্রন্থের পাতাও তো তাঁরা ওলটান। কবি হাফিজ অবশ্য বিস্তর ঢলাঢলির পর ওকীবহাল হয়ে অভয়বাণী বলেছিলেন,
মোল্লার কাছে কোরো না কিন্তু মোর পিছে অনুযোগ,
তারো আছে, জেনো, আমারি মতন, সুরামত্ততা রোগ।
তবু, এ কথাও তো অজানা নয় যে, মোল্লারাই নীতিবাগীশ সাজে আর পাঁচজনের তুলনায় বেশি।
এবং কার্যত দেখা গেল তারা এবং তাদের চেলাচামুণ্ডার দল ঝোপে-ঝাপে বসে আছে, শরাব-কবাব জান-কী-সাকী সুদ্ধ বমাল গ্রেফতার করার জন্য।
কবিরা এবং বিশেষ করে আমাদের মত তাঁদের গুণগ্রাহীরা, উচ্চকণ্ঠে তখন বললেন, এসব কবিতা রূপকে নিতে হয়। মদ্য অর্থ ভগবদপ্রেম, সাকি অর্থ যিনি সে প্রেম আমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেন, অর্থাৎ পীর, গুরু, মুরশীদ, পয়গম্বর। এবং এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, হাফিজ, আত্তার, এমন কি ওমর খৈয়ামের বহু কবিতার কোনো অর্থই করা যায় না, যদি সেগুলো রূপক দিয়ে অর্থ না করা হয়। কিন্তু বাদবাকিগুলো?
আমাদের পদাবলীতেও তাই। এবং এমন সব পদ আছে যাতে মর্ত্য আর অমর্ত্য প্রেম এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, দুটোকে আদৌ আলাদা করা যায় না—সমস্ত হৃদয় মন এক অদ্ভুত অনির্বচনীয় নবরসে আপ্লুত হয়ে যায়।
তোমার চরণে
আমার পরাণে
লাগিল প্রেমের ফাঁসি
সব সমর্পিয়া
এক মন হৈয়া
নিশ্চয় হইলাম দাসী।
মর্ত্যপ্রেমই যদি হবে তবে তো ‘পরানে’ ‘পরানে’ প্রেমের ফাঁসি লাগবে! ‘পরানে’ আর চরণে প্রেমের বাঁধ বেঁধে দিয়ে কী এক অপূর্ব অতুলনীয় ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হয়েছে—যার অনুভূতি এ-জগতে আরম্ভ আর পরিপূর্ণতা লাভ করবে সেই অমর্ত্যলোকে, ‘ব্যর্থ নাহি হোক এ কামনা।‘
কিন্তু মাঝে মাঝে মনে দ্বিধা জাগে, সর্বত্রই কি রূপকের শরণাপন্ন হতে হবে? যথা:
অদ্যাপ্য-শোক-নব-পল্লব-রক্ত হত্তাং
মুক্তাফল প্রচয়চুম্বিত-চুচকাগ্রাম।
অন্তঃস্মিতেন্দুসিত পাণ্ডুর গণ্ডদেশাং,
তাং বল্লাভাং রহসি সংবলিতাং স্মারামি।।
বিদ্যাপক্ষে
অশোক-পল্লব নব সম পাণিতলে।
কুচাগ্র শোভিত হয়েছে মুক্তাফলে।।
অন্তরে ঈষৎ হাস গণ্ডে বিকসিত।
শততের চন্দ্র যেন ত্রিলোক-মোহিত।
নির্জনেতে বসি করি সদা সম্ভাবনা।
প্রাণধিকা প্রেয়সীকে নিতান্ত কামনা।
তথাপি বিদ্যার নাহি পাই দরশন।
বিদ্যা তন্ত্র মন্ত্র করি ত্যজিব জীবন।
দ্বিতীয়ার্থ কালীপক্ষে।
রুধির-খর্পর হস্তে দিবানিশি যার।
রক্তবর্ণ করতল হয়েছে শ্যামার।।
উচ্চ পয়োধরপরি বান্ধিত কাঁচলী।
হীরক জড়িত হারে শোভে মুক্তাবলী।।
অন্তরে গভীর হাস্য ঈষদ্ধাস্য কালে।
কিরণে আছয়ে পাণ্ডুবর্ণা ভালে।।
অন্তর জগতে দেখি আলোক বিরাজে।
কি শোভা প্রকাশে কুলকুণ্ডলিনী মাঝে।।
স্ববল্লভ সংবলিতা বিশ্বের কারিণী।
নিদানে গর্জনে স্মরি তারে গো তারিণী।।
(চৌরপঞ্চাশৎ, ভারতচন্দ্র, বসুমতী সংস্করণ, পৃ. ৮)
পূৰ্বোল্লিখিত এই সব তাবৎ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ওমরের বিদ্রোহ।
গিয়াসউদ্দীন আবুল ফৎহ ওমর ইবন ইব্রাহীম অল-খৈয়াম ইরানদেশের নিশাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মদিন কিম্বা সন ঠিকমত জানা যায় নি, এমন কি তাঁর মৃত্যুর সনও মোটামুটি ১১২৩ খ্রিস্টাব্দ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।
খৈয়াম শব্দের অর্থ তাম্বু-নির্মাতা। এ ওজনের শব্দ বাঙলায় আরো আছে। ‘কত্তাল’ থেকে বাঙলা কোতয়াল, এবং ‘খম্মার’ থেকে ‘খোয়ারী’ (ভাঙা) শব্দ এসেছে। রান্নার মশলা-বিক্রেতা অর্থে বককাল শব্দও একদা বাঙলাতে সুপ্রচলিত ছিল—আরবিতে শব্দটির অর্থ ‘মুদী’ বা ‘মশলা বিক্রেতা’। ত্রিবর্ণের মূল ধাতুতে—যথা ‘দ-খ-ল’ ‘দখল করা’ ‘ক-ত-ল’ ‘কোতল করা’ দ্বিতীয় ব্যঞ্জন বর্ণকে দ্বিত্ব করে তাতে দীর্ঘ ‘আ’-কার যোগ করলে যে কর্তাবাচক শব্দ উৎপন্ন হয় তার অর্থ ‘ঐ কর্ম সে পুন পুন করে থাকে।‘ তাই ‘খম্মার’ অর্থ ‘যে ঘন ঘন মদ খায়’ (বাঙলার তাই সে সকাল বেলা খম্মারী বা খোঁয়ারী ভাঙে) অর্থাৎ ‘পাইকারী মাতাল’, ‘মদ খাওয়া তার ব্যবসা’। ‘কতল’ করা যার ব্যবসা সে কোতয়াল (‘কত্তাল’), ‘জল্লাদ’ও ঐ অর্থে ব্যবহার হয়। ‘খয়য়াম’ অর্থ ‘যে পুন পুন তাম্বু নির্মাণ করে’—‘তাম্বু-নির্মাণকারী’। বাঙলায় ‘খইআম’, ‘খইয়াম’ বা ‘খৈয়াম’ লিখলে মোটামুটি মূল উচ্চারণ আসে। অবশ্য ‘খ’-র উচ্চারণ বাঙলা মহাপ্রাণ ‘খ’-র মত নয়—আমরা বিরক্ত হলে যে রকম ‘আখ’-এর ‘খ’ অক্ষরটি উচ্চারণ করে থাকি অর্থাৎ খৃষ্ট কণ্ঠ্যব্যঞ্জন। স্কচের ‘লখ’ ও জর্মনের ‘বাখ’-এর ‘খ’-এর মত। আসামীতে ‘অহমিয়া’র ‘হ’ অনেকটা সেই রকম।
কিন্তু কবি ওমর তাঁবুর ব্যবসা করতেন না। ওটা তাঁর বংশের পদবী মাত্র। আজকের দিনের কোনো সরকার যে-রকম রাইটারজ বিল্ডিঙ্গে চিফ সেক্রেটারি (সরকার) নন কি কোনো ঘটকপদবীধারী যে-রকম সমাজে কুলাচার্যের কর্ম করেন না। ওমর কিন্তু তাঁর পরিবারের এই উপাধিটি নিয়ে তিক্ত ব্যঙ্গ করতে ছাড়েন নি:
জ্ঞান-বিজ্ঞান ন্যায় দর্শন সেলাই করিয়া মেলা
খৈয়াম কত না তাম্বু গড়িল; এখন হয়েছে বেলা
নরককুণ্ডে জ্বলিবার তরে। বিধি-বিধানের কাঁচি
কেটেছে তাম্বু—ঠোককর খায়, পথ-প্রান্তরে ঢেলা।
(লেখকের এমেচারি অক্ষম অনুবাদের রসিক পাঠক অপরাধ নেবেন না। অন্য কারো অনুবাদ না পেয়ে বাধ্য হয়ে মাঝে-মধ্যে এ ধরনের ‘অনুবাদ’ ব্যবহার করতে হয়েছে।)
এস্থলে উল্লেখ প্রয়োজন রুবাঈ জাতীয় শ্লোকে প্রায়শ প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ ছত্রে মিল থাকে—তৃতীয় ছত্রান্ত স্বাধীন। ইরানি আলঙ্কারিকরা বলেন, তৃতীয় ছত্রে মিল না দিলে চতুর্থ ছত্রের শেষ মিলে বেশি ঝোঁক পড়ে এবং শ্লোক সমাপ্তি তার পরিপূর্ণ গাম্ভীর্য ও তীক্ষ্ণতা পায়। কথাটা ঠিক, কারণ আমরাও তেতাল বাজাবার তৃতীয়ে এসে খানিকটা কারচুপি করলে সম মনকে ধাক্কা দেয় আরো জোরো। পাঠককে এই বেলাই বলে রাখি, তৃতীয় ছত্রে মিলহীন এই জাতীয় শোক পড়ার অভ্যাস করে রাখা ভালো। নইলে নজরুল ইসলামের ওমর-অনুবাদ পড়ে পাঠক পরিপূর্ণ রস গ্রহণ করতে পারবেন না। কারণ কাজী আগাগোড়া ক ক খ ক মিলে ওমরের অনুবাদ করেছেন। কান্তি ঘোষ করেছেন বাঙলা রীতিতে, অর্থাৎ ক ক খ খ।
ভাগ্যক্রমে ওমরের জীবনী সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। পাকাপাকি শুধু এইটুকু বলা যেতে পারে যে তিনি গণিতশাস্ত্রে অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন এবং অবসর কাটাবার জন্য দৈবেসৈবে চতুষ্পদী লিখতেন—তাঁর নামে প্রচলিত গজল, মসনবী বা অন্য কোনো শ্রেণীর দীর্ঘতর কবিতা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। এইটুকু সংবাদ ছাড়া বাদবাকি কিংবদন্তী। এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। যাঁর জন্মের তারিখ কেন, সন পর্যন্ত জানা নেই, যাঁর পরলোকগমনের সন পর্যন্ত পণ্ডিতদের গবেষণাধীনে তাঁর সম্বন্ধে যে প্রচুর কিংবদন্তী প্রচলিত থাকবে তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই।
তবে তিনি যে উত্তম গুরুর কাছে শিক্ষালাভ করেছিলেন সে-বিষয়ে পণ্ডিতগণ একমত। স্মরণ রাখা ভালো যে, ছাপাখানার প্রচলন না হওয়া পর্যন্ত অল্প লোকই গুরুর সাহায্য বিনা উচ্চশিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন।
কথিত আছে, বিখ্যাত ইদাম মুওয়াফফকের কাছে একই সময়ে তিনজন অসাধারণ মেধাবী ছাত্র শিক্ষালাভ করেন। এঁদের ভিতর খেলাচ্ছলে চুক্তি হয় যে, এঁদের কোনো একজন পরবর্তী প্রভাবশালী হতে পারলে তিনি অন্য দুজনকে সাহায্য করবেন। এঁদের একজন কালক্রমে প্রধান মন্ত্রী বা নিজা-উল-মুল্ক-এর পদ প্রাপ্ত হন। খবর পেয়ে দ্বিতীয় বন্ধু হাসন বিন সববাহ তাঁর কাছে এসে তাঁর পূর্ব প্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উচ্চ রাজকর্ম চান। বন্ধুর কৃপায় আশাতীত উচ্চপদ পেয়েও হাসন তাঁকে সরিয়ে নিজে প্রধান মন্ত্রী হবার জন্য ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন। কিন্তু শেষটায় ধরা পড়ে বাদশার হুকুমেই রাজপ্রাসাদ থেকে বহিষ্কৃত হন। হাসন প্রতিশোধ নেবার জন্য এক গুপ্ত প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে গোপন আততায়ী দিয়ে অনেক লোককে হত্যা করিয়ে প্রচুর অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জন করেন। ক্রুসেডের একাধিক খ্রিস্টান নেতা এইসব গুপ্তঘাতকের হস্তে প্রাণ দেন। এরা ভাঙ জাতীয় এক প্রকার হশীশ সেবন করতো বলে এদের নাম হয়েছিল ‘হশীশীয়ান এবং ইংরিজি ‘এ্যাসাসিন’—গুপ্তঘাতক—এই শব্দ থেকেই অর্বাচীন লাতিন তথা ফরাসির মাধ্যমে এসেছে। অনেকে বলেন, পরবর্তীকালে নিজাম-উল-মুল্ক যে গুপ্তঘাতকের হস্তে প্রাণ দেন, সেও হাসন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের সম্বন্ধে লেখকের ‘অরিজিন অব দি খোজা’ পুস্তক লেখকের বাল্যরচনা বলে দ্রষ্টব্যের মধ্যে ধর্তব্য নয়।
ওমরকে যখন নিজাম-উল-মুল্ক উচ্চপদ দিতে চাইলেন তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে নির্জনে অনটনবিহীন জীবনযাপনের সুবিধাটুকু মাত্র চাইলেন। এতো জানা কথা। যে ব্যক্তি স্বর্গসুখ বলতে বোঝে,
সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়,
খাদ্য কিছু পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়।
মৌন ভঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর—
সেই তো সখি স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্ণপুর।।
(কান্তি ঘোষ)
কিম্বা—
আমার সাথে আসবে যেথায়—দূর সে রেখে সহরগ্রাম
এক ধারেতে মরু তাহার, আর একদিকে শষ্প শ্যাম।
বাদশা-নফর নাইকো সেথা—রাজ্য-নীতির চিন্তা-ভার;
মামুদ শাহ?—দূরে থেকেই করব তাঁকে নমস্কার।
(কান্তি ঘোষ)
তার রাজপদ নিয়ে কি হবে? নিজাম-উল-মুল্ক বিচক্ষণ লোক ছিলেন, বুঝতে পারলেন, ওমরের খ্যাতি-প্রতিপত্তি প্রত্যাখ্যান মৌখিক বিনয় নয় এবং তাঁর জন্য সচ্ছল জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করে দিলেন। কবিও কখনো তাঁর মত পরিবর্তন করেননি। বস্তুত তাঁর কাব্যের মুল সুর ঐটিই।
কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর ডাক পড়লো রাজদরবারে-পঞ্জিকা সংশোধন করে দেবার জন্য। ইরানিদের নরোজ’ বা নববর্ষ আসে বসন্ত ঋতুতে, কিন্তু বহু শত বৎসর লীপ ইয়ার গোণা হয়নি বলে তখন আর নববর্ষ বসন্ত ঋতুতে আসছিল না। ওমর ঐ কর্মটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করে দিলেন।
ভাবতে আশ্চর্য লাগে, কবিরুপে যে ব্যক্তি বিশ্বজগতে বিখ্যাত তিনি আসলে ছিলেন বৈজ্ঞানিক। শুধু তাই নয়, ফিটজিরাণ্ডের মাধ্যমে ইয়োরোপে প্রচারিত হবার পূর্বেই ওমরের বিজ্ঞান চর্চা ফ্রান্সে অনুদিত হয়ে সেখানে তাঁর খ্যাতি সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। বর্তমান লেখক এসব লেখা দেখবার সুযোগ পায়নি, তাই এনসাইক্লোপিডিয়ার ‘কোনিক সেকশন’ অনুচ্ছেদ থেকে ইয়োরোপে ওমরের বৈজ্ঞানিক যশ সম্বন্ধে উদ্ধত দিচ্ছি:
Greek mathematics culminated in Apollonius, Little further advance was possible without new methods and higher points of view Much later. Arabs and other Muslims absorbed the classical science greedily: it was the Persian poet Omar Khayyam, one of the most prominent mediaeval mathematicians with his remarkable classification and systematic study of equations which he emphasized who blazed the way to the modern union of analysis and geometry. In his ‘Algebra’ he considered the cubic as soluble only by the intersection of conics and the biquadratic not at all.
শেষ ছত্রটির বাঙলায় অনুবাদ মূল ইংরিজি, এমন কি আধুনিক বাঙলা কবিতার চেয়েও শক্ত হয়ে যাবে বলে গোটা টুকরোটাই অতি অনিচ্ছায় ইংরিজিতেই রেখে দিতে বাধ্য হলুম। বৈজ্ঞানিক পাঠক বিনা অনুবাদেই এটি বুঝতে পারবেন, প্রাঞ্জল অনুবাদেও আমাদের মত অবৈজ্ঞানিকের কোনো লাভ হবে না।
ইরানের অধিকাংশ গুণীই একমত যে, ওমর তাঁর জীবনের প্রায় সব সময়টুকুই কাটিয়েছেন বিজ্ঞানচর্চায় এবং অতি অল্প সামান্য সময় নষ্ট করেছেন কাব্যলক্ষ্মীর আরাধনায়। তাই দীর্ঘ কবিতা লেখার ফুরসৎ তাঁর হয়ে ওঠেনি—এমন কি রুবাঈগুলোও গীতিরস দিয়ে সরস করবার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন নি।
গণিত এবং বিশেষ করে জ্যোতিষ চর্চার ফল ওমরের কাব্যে পদে পদে পাওয়া যায়। বস্তুত গ্রহ-নক্ষত্র যে অলঙ্ঘ্য প্রাকৃতিক নিয়মে চলে তার থেকেই তিনি দৃঢ় মীমাংসায় উপনীত হন যে, মানুষেরও কোনো প্রকারের স্বাধীনতা নেই, তার কর্মপদ্ধতি স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করার কোনো অধিকারই সে পায়নি। তাই
প্রথম মাটিতে গড়া হয়ে গেছে শেষ মানুষের কায়
শেষ নবান্ন হবে যে ধান্যে তারো বীজ আছে তায়।
সৃষ্টির সেই আদিম প্রভাতে লিখে রেখে গেছে তাই,
বিচার-কর্ত্রী প্রলয় রাত্রি পাঠ যা করিবে ভাই।
(সত্যেন দত্ত)
পৃথ্বী হতে দিলাম পাড়ি, নভঃগেহে মনটা লীন—
সপ্তঋষি যেথায় বসি ঘুমিয়ে কাটান রাত্রি দিন।
বিদ্যাটা মোর উঠলো ফেঁপে কাটালো কত ধাঁধায় ঘোর
মৃত্যুটা আর ভাগ্য লিখন—ওইখানে গোল রইল মোর।।
(কান্তি ঘোষ)
কিন্তু এস্থলে আমি ওমর-কাব্যের মল্লিনাথ হবার দুরাশা নিয়ে পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত হইনি। ওমরের নামে প্রচলিত প্রায় ছ’শটি রুবাইয়াৎ ইরানি বটতলাতেও পাওয়া যায়—পার্টিশনের পূর্বে কলকাতার ফার্সি বটতলা তালতলা অঞ্চলেও পাওয়া যেত। তার অতি অল্পই অনুবাদ করেছেন ফিটস্‌জেরাল্ড এবং সেই ছ’ শ’-র কটি কবিতা ওমরের নিজস্ব, তাই নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা: এখনো শেষ হয়নি। আমার বিশ্বাস কখনো হবে না। সেই ছশ চতুষ্পদীর টীকা পড়ার উৎসাহ ও ধৈর্য রসিকজনের থাকার কথা নয়—পণ্ডিতের থাকতে পারে। আমি রসিকের সেবা করি।
তাই আমিও ওমরের সামান্যতম ঐতিহাসিক পটভূমি নির্মাণ করার চেষ্টা করছি এবং তাও শুধু ওমরের বিদ্রোহী মনোভাব দেখাবার জন্য—কারণ ঐখানেই নজরুল ইসলামের সঙ্গে তিনি সখ্যসূত্রে আবদ্ধ হয়েছেন।
ওমরের প্রধান বিদ্রোহ ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে:
খাজা! তোমার দরবারে মোর একটি শুধু আর্জি এই
থামাও উপদেশের ঘটা, মুক্তি আমার এই পথেই।
দৃষ্টি-দোষে দেখছ বাঁকা আমার সোজা সরল পথ,
আমায় ছেড়ে ভালো করো, ঝাপসা তোমার চক্ষুকেই।
(কাজী সাহেবের অনুবাদ)
O master! grant us only this, we prithee.
Preach not! But mutely guide to bliss we prithee!
‘we walk not straight’—Nay it is thou who squintest!
Go heal thy sight and leave us in peace, we prithee!
(কার্নের অনুবাদ)
পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক রাজা-রাজড়ার শৌর্যবীর্য নিয়ে যে সব কবি ফিরদৌসীর ন্যায় আস্ফালন করে বর্তমানের আনন্দকে অবহেলা করনে তাঁদের সম্বন্ধে বলছেন—
ভাগ্য-লিপি মিথ্যা সে নয়—ফুরোয় যা তা ফুরিয়ে যাক,
কৈকোবাদ আর কৈখসরুর ইতিহাসের নামটা থাক।
রুস্তম আর হাতে-তায়ের কল্পকথা—স্মৃতির ফাঁস
সে-সব খেয়াল ঘুচিয়ে দিয়ে আজকে এস আমার পাশ।
(কান্তি ঘোষ)
দরবেশ-সুফীরা করতেন কৃচ্ছ্রসাধন এবং যোগচর্চা। পূর্বেই নিবেদন করেছি, তাঁরা নৃত্যের সঙ্গে চিৎকার করে করতেন নাম-জপ, তাঁদের বিশ্বাস, ঐ করেই ভগবদপ্রেম এবং চরম মোক্ষ পাওয়া যায়।
দ্রাক্ষালতার শিকড় সেটি তার না জানি কতই গুণ—
জড়িয়ে আছেন অস্থিতে মোর দরবেশি সাঁই যাই বলুন—
গগনভেদী চিৎকারে তার খুলবে নাকো মুক্তি দ্বার,
অস্থিতে এই মিলবে যে খোঁজ সেই দুয়ারের কুঞ্জিকার।
(কান্তি ঘোষ)
কিন্তু সবচেয়ে বেশি চতুষ্পদী তিনি রচনা করেছেন দার্শনিক এবং পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে। সেখানে তিনি জ্যেতির্বিদ ওমরকেও বাদ দেননি।
অস্তি-নাস্তি শেষ করেছি, দার্শনিকের গভীর জ্ঞান
বীজগণিতের সূত্র-রেখা যৌবনে মোর ছিলই ধ্যান;
বিদ্যারসে যতই ডুবি, মনটা জানে মনে (মানে?) স্থির—
দ্রাক্ষারসের জ্ঞানটা ছাড়া রসজ্ঞানে নই গভীর।
অর্থহীন, অর্থহীন, সমস্তই অর্থহীন। তাই ওমরের বার বার কাতর রোদন, দরদী ফরিয়াদ—
হেথায় আমার আসাতে প্রভূ হন নি তো লাভবান
চলে যাবো যবে হবেন না তিনি কোনো মতে গরীয়ান।
এ কর্ণে আমি শুনিনি তো কভু কোনো মানবের কাছে
এই আসা-যাওয়া কি এর অর্থ-খামাখা পোড়েন টান।
(লেখক)
তাই ওমরের শেষ মীমাংসা—একবার মরে যাবার পর তুমি আর এখানে ফিরে আসবে না। অতএব যতটুকু পারো, যতক্ষণ পারো দর্শন-বিজ্ঞান-সাঁই-সূফীদের ভুলে গিয়ে সাকি সুরা নিয়ে নির্জন কোণে আনন্দ করো।
মৃত্যু আসিয়া মস্তকে মোর আঘাত করার আগে
লে আও শরাব—লাও ঝটপট রাঙানো গোলাপি রাগে।
হায়রে মূর্খ! সোনা দিয়ে মোজা তোর কি শরীর খানা—?
গোর হয়ে গেলে ফের খুঁড়ে নেবে—? ও ছাই কি কাজে লাগে।
(লেখক)
কিন্তু একটা জিনিস ভুল করলে চলবে না। ওমর খাঁটি চার্বাকপন্থী এবং ঐ জাতীয় লোকায়তীদের মত নন। ‘ঋণ করে ঘি খাও, কারণ দেহ ভস্মীভূত হলে ঋণ তো আর শোধ করতে হবে না, অর্থাৎ ইহসংসারে কিম্বা পরলোকে অন্য কারো প্রতি তোমার কোনো নৈতিক দায়িত্ব—মরাল রেসপনসিবিলিটি নেই—এ তত্ত্বেও ওমর বিশ্বাস করতেন না। তাই তাঁর একমাত্র উপদেশ—
কারুর প্রাণে দুখ্‌ দিও না, করো বরং হাজার পাপ,
পরের মনে শান্তি নাশি বাড়িও না আর মনস্তাপ।
অমর-আশিস লাভের আশা রয় যদি, হে বন্ধু মোর,
আপনি সয়ে ব্যথা, মুছো পরের বুকের ব্যথার চাপ।
(নজরুল ইসলাম)
গুণীরা বলেন ‘কুরানই কুরানের সর্বশ্রেষ্ঠ টীকা।‘ তরুণদের আমি প্রায়ই বলি, রবীন্দ্রনাথের রচনাই তাঁর শ্রেষ্ঠ টীকা—ঐ কাব্যই বার বার অধ্যয়ন করো, অন্য টীকার প্রয়োজন নাই।‘ ওমরই ওমরের সর্বশ্রেষ্ঠ মল্লিনাথ এবং কাজীর অনুবাদ সকল অনুবাদের কাজী।
সৈয়দ মুজতবা আলী
রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম সূচী
আপনার জন্য প্রস্তাবিত
ভালো লাগা জানান
Scroll Up