এযাবৎ 50 টি গ্রন্থ সংযোজিত হয়েছে।
শিরাজ ইরানের মদিনা, পারস্যের তীর্থভূমি। শিরাজেরই মোসল্লা নামক স্থানে বিশ্ববিশ্রুত কবি হাফিজ চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জন্মগ্রহণ করেন।
ইরানের এক নীশাপুর (ওমর খাইয়াম-এর জন্মভূমি) ছাড়া আর কোনো নগরই শিরাজের মতো বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করে নাই। ইরানের প্রায় সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিরই লীলানিকেতন এই শিরাজ।
ইরানীরা হাফিজকে আদর করিয়া ‘বুলবুল-ই-শিরাজ’ বা শিরাজের বুলবুলি বলিয়া সম্ভাষণ করে।
হাফিজকে তাহারা শুধু কবি বলিয়াই ভালোবাসে না। তাহারা হাফিজকে ‘লিসান-উল-গায়েব (অজ্ঞাতের বাণী), ‘তর্জমান-উল-আসরার’ (রহস্যের মর্মসন্ধানী) বলিয়াই অধিকতর শ্রদ্ধা করে। হাফিজের কবর আজ ইরানের শুধু জ্ঞানী-গুণীজনের শ্রদ্ধার স্থান নয়, সর্বসাধারণের কাছে ‘দর্গা’, পীরের আস্তানা।
হাফিজের মৃত্যুর একশত বৎসরের মধ্যে তাঁহার কোনো জীবনী রচিত হয় নাই। কাজেই তাঁহার জীবনের অধিকাংশ ঘটনাই অন্ধকারের নীল মঞ্জুষায় চির-আবদ্ধ রহিয়া গিয়াছে। তাহার জন্ম-মৃত্যুর দিন লইয়া ইরানেও তাই নানা মুনির নানা মত। হাফিজের বন্ধু ও তাঁহার কবিতাসমূহের (দীওয়ানের) মালাকর গুল-আন্দামের মতে হাফিজের মৃত্যু-সাল ৭৯১ হিজরি বা ১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দ। কিন্তু তিনিও কবির সঠিক জন্ম-সাল দিতে পারেন নাই।
হাফিজের পিতা বাহাউদ্দীন ইস্পাহান নগরী হইতে ব্যবসা উপলক্ষে-শিরাজে আসিয়া বসবাস করেন। তিনি ব্যবসায়ে বেশ সমৃদ্ধি লাভ করেন, কিন্তু মৃত্যুসময়ে সমস্ত ব্যবসা এমন গোলমালে জড়িত করিয়া রাখিয়া যান যে, শিশু হাফিজ ও তাঁহার মাতা ঐশ্বর্যের কোল হইতে একেবারে দারিদ্রের করাল গ্রাসে আসিয়া পতিত হন। বাধ্য হইয়া তখন হাফিজকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া অর্থোপার্জন করিতে হয়। কোনো কোনো জীবনী লেখক বলেন, দারিদ্রের নিষ্পেষণে হাফিজকে তাঁহার মাতা অন্য একজন সঙ্গতিসম্পন্ন বণিকের হাতে সমর্পণ করেন। সেখানে থাকিয়াই হাফিজ পড়াশুনা করিবার অবকাশ পান।
যে প্রকারেই হউক, হাফিজ যে কবি-খ্যাতি লাভ করিবার পূর্বে বিশেষরূপে জ্ঞান অর্জন করিয়াছিলেন, তাহা তাঁহার কবিতা পড়িয়াই বুঝা যায়।
হাফিজের আসল নাম শামসুদ্দিন মোহাম্মদ। ‘হাফিজ’ তাঁহার ‘তখল্লুস’, অর্থাৎ কবিতার ভণিতায় ব্যবহৃত উপ-নাম। যাঁহারা সম্পূর্ণ কোরান কণ্ঠস্থ করিতে পারেন, তাঁহাদিগকে মুসলমানেরা ‘হাফিজ’ বলেন। তাঁহার জীবনী-লেখকগণও বলেন, হাফিজ তাঁহার পাঠ্যাবস্থায় কোরান কণ্ঠস্থ করিয়াছিলেন।
তাঁহার পাঠ্যাবস্থাতেই তিনি স্বভাবদত্ত শক্তিবলে কবিতা রচনা করিতে আরম্ভ করেন, কিন্তু তাহা তেমন আদর লাভ করিতে পারে নাই। কিছুদিন পরে ‘বাবা-কুহী’ নামক শিরাজের উত্তরে পর্বতোপরিস্থ এক দর্গায় (মন্দিরে) ইমাম আলী নামক এক দরবেশের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয়। সেদিন ‘বাবা-কুহী’তে সমস্ত রাত্রি ধরিয়া ধর্মোৎসব চলিতেছিল। হাফিজও ঐ উৎসবে যোগদান করিতে গিয়াছিলেন। ইমাম আলী হাফিজকে রহস্যময় কোনো স্বর্গীয় খাদ্য খাইতে দেন এবং বলেন, ইহার পরেই হাফিজ কাব্যলক্ষ্মীর রহস্যপুরীর সকল ঐশ্বর্যের অধিকারী হইবে। ইহা সত্য কিনা জানি না, কিন্তু হাফিজের সমস্ত জীবনী-লেখকই এই ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। শুধু উল্লেখ নয়, বিশ্বাসও করিয়াছেন।
হাফিজ তাঁহার জীবিতকালে তাঁহার কবিতাসমূহ (দীওয়ান) সংগ্রহ করিয়া যান নাই। তাঁহার বন্ধু গুল-আন্দামই সর্বপ্রথম তাঁহার মৃত্যুর পর ‘দীওয়ান’ আকারে হাফিজের সমস্ত কবিতা সংগ্রহ ও সংগ্রথিত করেন। কাজেই মনে হয়, হাফিজের পঞ্চশতাধিক যে কবিতা আমরা এখন পাইয়াছি, তাহা ছাড়াও অনেক কবিতা হারাইয়া গিয়াছে, বা তিনি সংগ্রহ করিতে পারেন নাই।
হাফিজ ছিলেন উদাসীন সুফী। তাহার নিজের কবিতার প্রতি তাহার মমতাও তেমন ছিল না। তাই কবিতা লিখিবার পরই তাঁহার বন্ধুবান্ধব কেহ সংগ্রহ না করিয়া রাখিলে তাহা হারাইয়া যাইত। কিন্তু তাঁহার কবিতায় অধিকাংশই গজল-গান বলিয়া, লেখা হইবামাত্র মুখে মুখে গীত হইত। ধর্মমন্দির হইতে আরম্ভ করিয়া পানশালা পর্যন্ত সকল স্থানেই তাঁহার গান আদরের সহিত গীত হইত।
হাফিজের গান অতল গভীর সমুদ্রের মতো। কূলের পথিক যেমন তাহার বিশালতা, তরঙ্গলীলা দেখিয়া অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া থাকে, অতল-তলের সন্ধানী ডুবুরী তেমনি তাহার তলদেশে অজস্র মণিমুক্তার সন্ধান পায়। তাহার উপরে যেমন ছন্দ-নর্তন, বিপুল বিশালতা; নিম্নে তেমনি অতল গভীর প্রশান্তি, মহিমা। …
আকাশের নীল পেয়ালা উপচিয়া আলোর শিরাজী ধরণীতে গড়াইয়া পড়ে, উন্মত্ত ধরণী নাচিয়া নাচিয়া শূন্যে ঘুরিয়া ফেরে। তারকার মণি-মাণিক্য-খচিত আকাশ কি পেয়ালার সাকিকে কবি ডাকে, শারাব ভিক্ষা করে আর গান গায়—‘বদেহ সাকি ময়ে বাকি!’ ওগো সাকি, আরও আরও শারাব ঢাল! কিছুই বাকি রাখিও না! পাত্র উজাড় করিয়া শারাব ঢাল! …
কেহ কেহ বলেন, হাফিজ অভিমান করিয়াই তাঁহার জীবিকালে বহু বন্ধু বান্ধবের শত সনির্বন্ধ অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁহার কবিতাসমূহ সংগ্রহ করিয়া যান নাই। হাফিজের সময়ে শিরাজের শাসনকর্তা ছিলেন শাহ আবু ইসহাক ইঞ্জা। তিনি নিজেও একজন কবি ও সমঝদার ছিলেন। তিনি হাফিজের অন্যতম ভক্ত এবং পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ইহার কিছুদিন পরে শাহসুজা শিরাজের শাসনকর্তা হন। সুজা ইমাদ কিরমানী নামক একজন কবির অতিশয় ভক্ত ছিলেন। এমনকি তিনি হাফিজকে বড় কবি বলিয়াই স্বীকার করিতেন না। শাহ সুজাও নিজে কবি ছিলেন এবং তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হাফিজের সমকক্ষ ছিলেন না বলিয়াই ইমাদকে বড় কবি বলিয়া হাফিজকে হেয় করিবার প্রয়াস পাইতেন। একবার শাহ সুজা হাফিজের কবিতার নিন্দাবাদ করায়, হাফিজ উত্তর দেন, ‘তবুও আমার এই কবিতা সারা দেশের লোকে কণ্ঠস্থ, প্রশংসা এবং আবৃত্তি করে, কিন্তু এই নগরে এমন অনেক কবি আছে, যাহাদের কবিতা এই শহরের সীমা অতিক্রম করিতে পারে না।‘
এই উত্তর শুনিয়া শাহ সুজার বুঝিতে বাকি রহিল না যে, ইহা তাঁহাকেই উল্লেখ করিয়া বলা হইয়াছে। কিন্তু তিনি যতই ক্রোধান্বিত হন, কিছু করিতেও পারিলেন না। ইহার অল্পদিন পরেই হাফিজের দুই লাইন কবিতা তাঁহার হস্তগত হয়।—
‘গর্‌ মুসলমানী আজ্‌ আনস্‌ত্‌ কে হাফিজ দারদ্‌
ওয়ায়্‌ আগর আজ্‌ পেয়্‌ ইমরোজ বুয়দ্‌ ফর্‌দায়ে।
‘হাফিজের যে ধর্ম, ইহাই যদি মুসলমান ধর্ম হয়, হায়, তাহা হইলে কবে আজকার দিন শেষ হইয়া কল্য আসিবে!’
এই কবিতার সুবিধা লইয়া শাহ সুজা মনস্থ করেন, হাফিজের বিধর্মী বলিয়া বিচার হইবে। এই সংবাদ পাইয়া হাফিজ অতিশয় সন্ত্রস্ত হইয়া পড়েন। সেই সময় সৌভাগ্যক্রমে শিরাজে মৌলানা জায়নুদ্দিন আবু বকর তায়াবাদি উপস্থিত ছিলেন। হাফিজ গিয়া তাঁহার পরামর্শ ভিক্ষা করেন। তিনি হাফিজকে উহার সহিত আরও এমন দুই লাইন কবিতা জুড়িয়া দিতে বলেন, যাহার দ্বারা পূর্বের দুই লাইন কবিতার অর্থ একেবারে উল্টা হইয়া যায়।
তদনুযায়ী হাফিজ উক্ত কবিতার সঙ্গে নিম্নলিখিত দুই লাইন কবিতা জুড়িয়া দেন—
‘ই হদিসম চে খোশ আমদ্‌ কে সহরগাহ্‌মি গোফ্‌ত্‌
বর্‌ দরে ময়কদয়ে বা দফ ও নেয়্‌ তর্‌সায়ে।‘
‘একজন খ্রিষ্টধর্মী যখন এক সরাই-এর দ্বারে বসিয়া তান্দুরা এবং বাঁশি লইয়া এই গান গাহিতেছিল, তখন সেই প্রাতঃকালে আমার কাছে সে গান কেমন মজার শুনাইতেছিল!’
ইহার পরে নাস্তিক বলিয়া অভিযুক্ত হইয়া তিনি শেষের দুই লাইন কবিতা দেখাইয়া বলেন যে, পরিপূর্ণ কবিতাটি এই। সুতরাং বিচারে তিনি মুক্তি পান। …
হাফিজ সম্বন্ধে বিশ্ববিজয়ী বীর তৈমুরকে লইয়া একটি গল্প প্রচলিত আছে। হাফিজের নিম্নলিখিত দুই লাইন কবিতা জগদ্বিখ্যাত হইয়া গিয়াছে:—
‘আগ্‌র্‌ আঁ তুর্কে শিরাজী বেদস্ত আরদ দিলে মারা,
বখালে হিন্দুয়শ্‌ বখ্‌শম্ সমরকন্দ ও বোখারা রা !!’
‘যদিই কান্তা শিরাজ-সজনী ফেরৎ দেয় মোর চোরাই দি ফের,
সমরকন্দ ও বোখারায় দিই বদল তার লাল গালের তিলটের!’
সেই সময় তৈমুরের সাম্রাজের রাজধানী ছিল সমরকন্দ। হাফিজ তাঁহার প্রিয়ার গালের তিলের জন্য তৈমুরের সাম্রাজ্য ও রাজধানী বিলাইয়া দিতে চাহেন শুনিয়া তৈমুর অতিশয় ক্রোধান্বিত হইয়া পারস্য জয়ের সময় হাফিজকে ডাকিয়া পাঠান। উপায়ান্তর না দেখিয়া হাফিজ তৈমুরকে বলেন যে, তিনি ভুল শুনিয়াছেন, শেষের লাইনের ‘সমরকন্দ ও বোখারা’র পরিবর্তে ‘দো মন কন্দ ও সি খোর্মারা হইবে।
‘আমি তাহার গালের তিলের বদলে দুমন চিনি ও তিন মণ খর্জুর দান করিব!’
কেহ কেহ বলেন, হাফিজ এ উত্তর দেন নাই। তিনি নাকি দীর্ঘ কুর্নিশ করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘সম্রাট! আমি আজকাল এই রকমই অমিতব্যয়ী হইয়া পড়িয়াছি!’ এই উত্তর শুনিয়া তৈমুর এত আনন্দ লাভ করেন যে, হাফিজকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে বহুমূল্য পারিতোষিক প্রদান করেন।
হাফিজের নামে এইরূপ বহু গল্প প্রচলিত আছে, কিন্তু তাহার অধিকাংশই বিশ্বাসযোগ্য নহে।
হাফিজের কবিতা পড়িয়া একবার মনে হয়, তিনি উদাসীন সুফী ছিলেন। আবার দুই একটি কবিতা পড়িয়া মনে হয়, তিনি বুঝি সংসারীও ছিলেন। বিশেষ করিয়া তাঁহার নিম্নলিখিত কবিতা পড়িয়া মনে হয়; ইহা তাহার কোনো প্রিয় পুত্রের অকালমৃত্যুকে উল্লেখ করিয়া লেখা হইয়াছিল।—
‘দিলা দীদী কে আঁ ফরজানা ফর্‌জন্দ্‌
চে দিদ্ আন্দর খমে ই তাকে রঙ্গিন্
বজায়ে লওহে সিমিন দর্‌ কিনারশ্‌
ফলকে বর শের নেহাদ লওহে সঙ্গীন্।‘
‘ওরে হৃদয়! তুই দেখেছিস—
পুত্র আমার আমার কোলে,
কি পেয়েছে এই সে রঙিন
গগন-চন্দ্রাতপের তলে।
সোনার তাবিজ রূপার সেলেট
মানাত না বুকে রে যার,
পাথর চাপা দিল বিধি
হায় কবরের সিথানে তার।’
১৩৬২ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে ডিসেম্বর তাঁহার আর একটি পুত্র সন্তানের মৃত্যু হয়। ইহাও তাঁহার অন্য এক কবিতা পড়িয়া জানা যায়।
হাফিজের সমস্ত কাব্য ‘শাখ-ই-বাত’ নামক কোনো ইরানী সুন্দরীর স্তবগানে মুখরিত। অনেকে বলেন, ‘শাখ-ই-নবাত’ হাফিজের দেওয়া আদরের নাম। উহার আসল নাম হাফিজ গোপন করিয়া গিয়াছে। কোন ভাগ্যবতী এই কবির প্রিয়া ছিলেন, কোথায় ছিল তাঁর কুটির, ইহা লইয়া অনেকে অনেক জল্পনা-কল্পনা করিয়াছেন। রহস্য-সন্ধানীদের কাছে এই হরিণ-আঁখি সুন্দরী আজো রহস্যের অন্তরালেই রহিয়া গিয়াছেন।
কেহ কেহ বলেন, এই ‘শাখ-ই-নবাতে’র সহিতই হাফিজের বিবাহ হয় এবং হাফিজের জীবিতকালেই তাহার মৃত্যু হয়। কিন্তু কোনো জীবনী-লেখকই একথা নিশ্চিতরূপে বলিতে পারেন নাই।
হাফিজ যৌবনে হয়ত শারাব-সাকির উপাসক ছিলেন, পরে যে সুফী সাধকরূপে দেশের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিয়াছিলেন তাহা প্রত্যেক ইরানীই বিশ্বাস করে।
তাঁহার মৃত্যু সম্বন্ধে একটি বিস্ময়কর গল্প শুনা যায়। শিবলি নোমানী, ব্রাউন সাহেব প্রভৃতি পারস্য-সাহিত্যের সকল অভিজ্ঞ সমালোচকই এই ঘটনা উল্লেখ করিয়াছেন।
হাফিজের মৃত্যুর পর একদল লোক তাঁহার জানাজা পড়িতে (মুসলমানী মতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করিতে) ও কবর দিতে অসম্মত হয়। হাফিজের ভক্তদলের সহিত ইহা লইয়া বিসম্বাদের সৃষ্টি হইলে কয়েকজনের মধ্যস্থতায় উভয় দলের মধ্যে এই শর্তে রফা হয় যে, হাফিজের সমস্ত কবিতা একত্র করিয়া একজন লোক তাঁহার যে কোনো স্থানে খুলিয়া দিবে; সেই পৃষ্ঠার প্রথম দুই লাইন কবিতা পড়িয়া হাফিজের কি ধর্ম ছিল তাহা ধরিয়া লওয়া হইবে।
আশ্চর্যের বিষয়, এইরূপে নিম্নলিখিত দুই লাইন কবিতা পাওয়া গিয়াছিল।—
‘কদমে দরিগ মদার আজ জানাজায়ে হাফিজ,
কে গর্‌চে গর্‌ কে গোনাহস্‌ত্‌ মি রওদ্‌ বেহেশ্‌ত্‌।‘
‘হাফিজের এই শব হতে গো তুলো না কো চরণ প্রভু
যদিও সে মগ্ন পাপে বেহেস্ত সে যাবে তবু।‘
ইহার পরে উভয় দল মিলিয়া মহাসমারোহে হাফিজকে এক আঙুর-বাগানে সমাহিত করেন। সে স্থান আজিও ‘হাফিজিয়া’ নামে প্রসিদ্ধ।
দেশ-বিদেশ হইতে লোক আসিয়া আজও কবির কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে।
কথিত আছে, বাংলার কোনো শাসনকর্তা হাফিজকে তাঁহার সভায় আমন্ত্রণ করিয়া পাঠান। হাফিজ আসিতে সম্মতও হইয়াছিলেন। পারস্য উপসাগরের কূলে আসিয়া যখন তিনি জাহাজে উঠিতে যাইবেন, সেই সময় ভীষণ ঝড় ওঠে। ইহাতে হাফিজ দৈব প্রতিকূল ভাবিয়া আবার শিরাজে ফিরিয়া আসেন এবং বাংলার শাসনকর্তার কাছে যে কবিতাটি পাঠাইয়া দেন তাহার মর্মার্থ এইরূপ:—
‘আজকে পাঠাই বাংলায় যে ইরানের এই ইক্ষু শাখা,
এতেই হবে ভারতের সব তোতার চক্ষু মিষ্টিমাখা।
দেখ গো আজ কল্পলোকের কাব্যদূতীর অসম সাহস,
এক বছরের পথ যাবে যে, একটি নিশি যাহার বয়স।’
হাফিজ পারস্য ছাড়িয়া আর কখনো কোথাও যান নাই। স্বদেশ এবং স্বপল্লীর প্রতি তাঁহার অণু-পরমাণুতে অপূর্ব মমতা সঞ্চিত ছিল। বহু কবিতায় তাঁহার বাস পল্লী ‘মোসল্লা এবং রোকনাবাদে’র খালের প্রশংসা দেখিতে পাওয়া যায়।
হাফিজ নিজের সম্বন্ধে বলিয়া গিয়াছেন—
বর সরে তরবতে মা চুঁগুজরি হিম্মত খাহ্,
কে জিয়ারহে রিন্দা জাহাঁ খাহেদ শোদ্‌!’
‘আমার গোরের পার্শ্ব দিয়া যেতে চেয়ে আশিস্ তুমি,
এ গোর হবে ধর্ম-স্বাধীন নিখিল-প্রেমিক-তীর্থভূমি!’
আজ সত্য সত্যই হাফিজের কবর নিখিলের প্রেমিকের তীর্থভূমি হইয়া উঠিয়াছে।
আপনার জন্য প্রস্তাবিত
Scroll Up