এযাবৎ 50 টি গ্রন্থ সংযোজিত হয়েছে।
[রোগ-শয্যায় শায়িত লায়লি – অস্তমান সপ্তমীর চাঁদের মতো ক্ষীণপ্রভ। গভীর অন্ধকার রাত্রি। শিয়রে বিমলিন-জ্যোতি তৈল-প্রদীপ আর চিত্র-অঙ্কনরত স্বামী।]
লায়লি
:
তোমার ছবি আঁকা হল? – (চিত্রকর নীরবে-একমনে ছবি এঁকে চলেছে) – ওগো শুনছ?
চিত্রকর
:
(চমকে উঠে) অ্যাঁ! আমায় ডাকছিলে লায়লি?
(লায়লি অভিমানে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে চোখের জল গোপন করল। চিত্রকর আবার একমনে চিত্র আঁকতে লাগল।)
লায়লি
:
(পাশ ফিরে গভীর দীর্ঘ-নিশ্বাস মোচন করে) দোহাই! তুমি অন্য ঘরে ছবি আঁক গিয়ে! আমার বড্ড বিশ্রী লাগছে! (শেষের কথা কয়টা বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল)
  
(চিত্রকরের হাত হতে তুলি পড়ে গেল – লায়লির কান্না-দীর্ণ স্বরের তীব্রতায়)
চিত্রকর
:
(সবিস্ময়ে) লায়লি! তুমি কাঁদছ?
লায়লি
:
(তীব্রস্বরে) না! রহস্য করছি! তুমি একটু অন্য ঘরে উঠে যাবে? দয়া করে আমায় একটু একলা থাকতে দাও!
চিত্রকর
:
(উদাসীনভাবে) আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। তোমার রোগ-যন্ত্রণা আর বাড়াতে চাইনে তোমার কাছে থেকে। (চলে যাওয়ার উপক্রম করল।)
লায়লি
:
যেয়ো না। দুটো কথা আছে, শুনে যাও।
চিত্রকর
:
(বসে পড়ে) বলো।
লায়লি
:
ওখানে না। আমার পাশে এসো বসো।
চিত্রকর
:
(লায়লির পাশে বসে) বলো। (আনমনে লায়লির কপোল ও ললাট হতে অলকগুচ্ছ তুলে দিতে লাগল।)
লায়লি
:
সত্যি করে বলো দেখি, তুমি বিয়ে করেছিলে কেন?
চিত্রকর
:
বিয়ে করার জন্যই।
লায়লি
:
হেঁয়ালি রাখো। তুমি শিল্পী, তুমি কেন আমাকে তোমার দুঃখের সাথি করে তোমার স্বচ্ছন্দ জীবনকে এমন বোঝা করে তুললে? আমি জানি আর তুমিও জান, তুমিও শান্তি পাচ্ছ না, আমিও সোয়াস্তি পাচ্ছিনে, আমাদের এই টানাটানির জীবন নিয়ে।
চিত্রকর
:
তুমি সেরে ওঠো, তারপর সব কথা বলব। আজ নয়।
লায়লি
:
না, তুমি আজই বলো। মরতেই যদি হয়, তবে ও-জিনিসটা যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই ভালো। জীবনে অনেক টানাহেঁচড়া করেছি, মরণে আর ওটা সইবে না।
চিত্রকর
:
সব কথা কি সব সময় মানুষ বলতে পারে লায়লি? … আমি কি শুধু শিল্পীই? আমি কি সিরাজ নই? বিয়ে তোমায় করেছে মানুষ-সিরাজ, শিল্পী-সিরাজ নয়।…তোমাতে আমাতে দ্বন্দ্ব কোন্খানে, জান? তুমি চাও শুধু মানুষ-সিরাজকে, শিল্পী-সিরাজকে তুমি দু-চোখে দেখতে পার না। অথচ আমি মানুষ-সিরাজ যতটুকু, তার অনেকগুণ বেশি শিল্পী-সিরাজ।
লায়লি
:
(অনেকক্ষণ ভেবে) ধরে নিলুম, তোমার কথাই সত্যি। তা হলেও, আমার মাঝে কি শুধু রক্ত-মাংসের মানুষেরই ক্ষুধা পরিতৃপ্তির সমাপ্তি আছে, আনন্দবিলাসী শিল্পীর ধেয়ান-লোকের কোনো কিছুই নেই?
চিত্রকর
:
আছে। তোমাকে আমার ধেয়ান-লোকে পাই, যখন তুমি থাক আমার ধরা-ছোঁয়ার আড়ালে। তখন তুমি শুধু আমার অঙ্ক-লক্ষ্মী নও, শিল্পী-সিরাজের হৃদয়-লক্ষ্মী, ধেয়ানের ধন।… যে ফুলের মালা সন্ধ্যায় লাগে ভালো, নিশিশেষে তা যদি বাসি ঠেকে, লায়লি তার জন্য অপরাধী তুমিও নও, আমিও নই। চির-সুন্দরের তরে নিত্য নব-তৃষা মানুষের চিরকেলে অপরাধ। এই তৃষা যার যত প্রবল, সে সুন্দরের তত বড়ো ধেয়ানী। মানুষের শৃঙ্খলিত সমাজে হয়তো সেই আবার তত বড়ো অপরাধী।…মস্ত ভুল করেছি লায়লি, স্বর্গের সুন্দরকে ধুলার আবিলতায় নামিয়ে।
লায়লি
:
আমিও বুঝতে পারিনে, অপরাধ কার কতটুকু। তোমার কলঙ্কে যখন দেশ ছেয়ে গেছে, তখনও আমি তোমায় ভালোবেসেছি সকলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সবাই যখন বড়ো করে দেখত তোমার কলঙ্ক, আমি তখন দেখেছি তোমার জ্যোৎস্না। আমি কতদিন অহংকার করে বলেছি, ‘কলঙ্কী চাঁদকে দেখে সাগরের বুকেই জোয়ার জাগে, খানা-ডোবা চাঁদকে চেনেও না, তাদের বুকে জোয়ারও জাগে না।… কিন্তু আজ কেন মনে হচ্ছে, আমিও তোমায় ভালোবাসিনি, তোমার যশ, তোমার খ্যাতিকে ভালোবেসেছি। নইলে সাগরে জোয়ার তো শুধু পূর্ণিমার চাঁদকে দেখেই জাগে না, অমানিশির নিরুজ্জ্বল চাঁদকে দেখেও সে সমান উতলা হয়।
চিত্রকর
:
দূরে থেকে তুমি ভালোবেসেছিলে – শিল্পীকে, কাছে এসে পেতে চাও সিরাজকে – মানুষকে।…এটাই তোমাদের নারীর ধর্ম। তোমরা আকাশের জ্যোতিষ্ক হতে চাও না – হতে চাও মাটির ফুল। তোমরা শুধু দূরের সুন্দরের ধ্যানেই তৃপ্ত হতে পার না, নিকটের নির্মমকেও পেতে চাও। যে বিরহে তোমরা বেদনা-ক্ষুণ্ন বিষাদিনী, সেই বিরহে পুরুষ হয়ে ওঠে ধেয়ানী তপস্বী। তোমরা কাঁদ, পুরুষ ধ্যান করে। তোমরা যেখানে কর অভিসম্পাত, পুরুষ সেখানে করে স্তব।
লায়লি
:
কী জানি, তোমাদের সব কথা সব সময় বোঝা যায় না। আজও বুঝি না।… আমার দুঃখ এইটুকু যে, আমার বলতে তোমার কাছে কিছু পেলুম না। শিল্পী-সিরাজ তো সকলের। সেখানে আর একার দাবি অস্বাভাবিক আবদার, তা বুঝি। কিন্তু যদি দেখি, সিরাজ শুধু শিল্পীই, সে মানুষ-শিরাজ নয়, সেখানে আমার সান্ত্বনা কোথায়? দূরের মানুষ অল্প নিয়েই খুশি থাকতে পারে, আমার পোড়াকপাল – আমি যে তোমার নাকি সহধর্মিণী, নইলে কীসের দুঃখ আমার?
চিত্রকর
:
উপায় নাই লায়লি, উপায় নাই! যাদের আমি একদিন আমার সকল হৃদয়-মন দিয়ে চেয়েছি, আজ তারা সবাই আমার কাছে পুরাতন হয়ে উঠেছে। শিল্পী-আমারই জয় হল। মানুষ আমি বহুদিন হল মরে গেছি, মানুষের সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না কেন যেন আর আমায় বিচলিত করতে পারে না। শুধু মনে হয় প্রাণ ভরে সুন্দরকে দেখে যাই, রেখায় রেখায় রঙে রঙে তাকে অমর করে যাই। আমরা শিল্পীরা তো চির-নূতন করে রেখেছি, চির-যৌবন দিয়েছি সুন্দরকে, আমাদের মনের নবীনতা দিয়ে, যৌবন দিয়ে।…যখন মনে করি, তুমি আমার কেউ নও, মনে হয় কোন লোকের যেন অপরিচিতা, তখন তুমি সুন্দর। যখন তোমায় পাই বাহুর বন্ধনে বুকের পাশে, তখন তুমি নারী – প্রজাপতির পাখার রং-এর মতো ছুঁলেই রং যায় মুছে।
লায়লি
:
আমি যদি মরে যাই, তোমার দুঃখ হবে না? তুমি কাঁদবে না?
চিত্রকর
:
না। শয্যাপার্শ্বে বাহুর বন্ধনে যাকে ধরতে পারিনি, তাকে ধরব ধেয়ানের গোপন-লোকে। আমার তুলির রেখায় রেখায় রঙে রঙে তোমায় দান করব চির-বৈচিত্র্য, চির-নবীনতা, চির-যৌবন। মরলোকের বধূ আমার হবে অমর লোকের অপ্সরি। আমার গৃহলক্ষ্মী হবে নিখিল-শিল্পীর বিশ্বলক্ষ্মী!
লায়লি
:
ওগো দোহাই তোমার! আমি চাইনে অত গৌরব, অত মহিমা! তুমি আমায় বাঁচিয়ে তোলো! আমি বাঁচতে চাই। তোমায় পেতে চাই ! মরতেই যদি হয়, এত দারুণ তৃষ্ণা নিয়ে মরতে চাইনে। আমি মরতে চাই স্বামীর কোলে, পুত্র-কন্যা আত্মীয়-স্বজনের মাঝে। যেতে চাই বাড়ি-ভরা ক্রন্দনের তৃপ্তি নিয়ে। এমন করে এই মাঠের মাঝে শূন্য ঘরে এক পাষাণের পায়ের তলে পড়ে মরবার আমার সাধ নেই!
চিত্রকর
:
(অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে) উপায় নেই লায়লি, উপায় নেই! সত্যিই আমি নিরুপায়। (বাহিরে দরজায় কাহার করাঘাত শোনা গেল) কে?
  
(বাহিরের শব্দ।) আমি তোমার বন্ধু।
লায়লি
:
(চিৎকার করে) খুলো না! দোর খুলো না! আমি চিনেছি, ও কে। ও ডাইনি, ও চিত্রা।
চিত্রকর
:
ছিঃ লায়লি! তুমি শিক্ষিতা সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে, এ কী ব্যবহার তোমার?
চিত্রা
:
(বাহির হতে) আমি ভিতরে যাব না বন্ধু, তুমি বেরিয়ে এসো।
লায়লি
:
যাও! তোমার বাইরের ডাক এসেছে। তোমার সুন্দরের ধ্যান আমি ভাঙব না। আমায় ক্ষমা করো। আমি যেদিন থাকব না ওই চিত্রার মাঝেই আমাকে স্মরণ করো।
[চিত্রকর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল। ঘরের প্রদীপও সাথে সাথে নিভে গেল।]
শিল্পী সূচী
আপনার জন্য প্রস্তাবিত
ভালো লাগা জানান
Scroll Up