নজরুল রচনাবলীতে স্বাগতম!

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে স্থবির সমাজ ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে চুরমার করেছিলেন। তিনি কেবল বাঙালির জাতীয় কবি নন, বরং তিনি ছিলেন একাধারে বিদ্রোহী, সাম্যবাদী, প্রেমিক এবং শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যকর্ম মানবসভ্যতার বিবর্তনের ধারায় এক অনন্য ও মহাজাগতিক চেতনার শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।
বিদ্রোহী ও সাম্যবাদী চেতনা– নজরুলের মূল পরিচয় তাঁর ‘বিদ্রোহী’ সত্তায়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে তিনি একাধারে ব্রিটিশ রাজশক্তি এবং সমাজের সব জরাজীর্ণ গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তাঁর ‘অগ্নি-বীণা’, ‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থগুলো পরাধীন ভারতের তরুণদের মনে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছিল। তবে তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক ছিল না; তা ছিল সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার এবং শ্রেণিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে। ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন— "গাহি সাম্যের গান / যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান"। হিন্দু-মুসলিম মিলনের এমন অসাম্প্রদায়িক ও উদার রূপ তাঁর আগে আর কেউ এত জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি।
সঙ্গীত ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি– নজরুল কেবল দ্রোহের কবি নন, তিনি ছিলেন সুর ও ছন্দের জাদুকর। প্রায় তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করে তিনি ‘নজরুল সঙ্গীত’ নামক এক পৃথক ও সমৃদ্ধ ধারা তৈরি করেছেন। তাঁর গজল বাংলা গানে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে তিনি যেমন শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তন লিখেছেন, তেমনি রচনা করেছেন কালজয়ী হামদ ও নাত। প্রেমের কবি হিসেবেও তিনি অনন্য; তাঁর ‘দোলন-চাঁপা’ বা ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যে বিরহ ও ভালোবাসার যে গভীর ব্যাকুলতা ফুটে উঠেছে, তা পাঠকের হৃদয়কে আর্দ্র করে দেয়।
গদ্য ও সাংবাদিকতা– কবিতা ও গানের পাশাপাশি তাঁর গল্প, উপন্যাস (যেমন: ‘বাঁধন-হারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’) এবং প্রবন্ধেও সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও অধিকারের কথা ফুটে উঠেছে। ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি নির্ভীক সাংবাদিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম কেবল অক্ষর বা শব্দের সমষ্টি নয়, এটি এক জীবন্ত বিপ্লব। তাঁর সৃষ্টি আমাদের সংকটে শক্তি দেয়, হতাশায় আশা জাগায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়। বাংলা সাহিত্যের অমূল্য এই সম্পদগুলো আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ‘এডুলিচার’ শুরু করেছে ‘নজরুল রচনাবলী’ নামক বিশুদ্ধজ্ঞান প্রকল্পের। এটি আমাদের মননশীল ঐতিহ্যকে চিরভাস্বর করে রাখবে।