মৃত্যুক্ষুধা

কাজী নজরুল ইসলাম

এই পাতা মূল গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত নয়; এটি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

‘মৃত্যুক্ষুধা’; মৃত্যুর মত ভয়াবহ যে ক্ষুধা—নামটির মধ্যেই যেন উপন্যাসটির সমগ্র জীবনদর্শন নিহিত। যে ক্ষুধা শুধু অন্নের অভাব নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য, বঞ্চনা, সামাজিক বৈষম্য, প্রেমের অপূর্ণতা এবং মর্যাদাহীন জীবনের যন্ত্রণা—সেই বহুমাত্রিক ক্ষুধাই কাজী নজরুল ইসলামের ‘মৃত্যুক্ষুধা’র কেন্দ্রীয় বিষয়। বাংলা সাহিত্যে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জীবনকে এত তীব্র সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিতে উপস্থাপন করা রচনার সংখ্যা খুব বেশি নয়। নজরুলের এই উপন্যাসে ক্ষুধার্ত মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্য, ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধিতা, নারীর সামাজিক অবস্থান, প্রেম, বৈধব্য, ঔপনিবেশিক শাসন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন।

‘মৃত্যুক্ষুধা’ নজরুলের দ্বিতীয় উপন্যাস। এটি প্রথমে ‘সওগাত’ পত্রিকায় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ থেকে ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখে, অর্থাৎ ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে, প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। নজরুলের উপন্যাস তিনটি—‘বাঁধনহারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ও ‘কুহেলিকা’—এর মধ্যে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ তাঁর সমাজমনস্ক ও বাস্তববাদী কথাসাহিত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলোর একটি।

নজরুল মূলত কবি, গীতিকার ও সংগীতস্রষ্টা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত হলেও তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিসর ছিল বহুবিস্তৃত। কবিতা ও গানের পাশাপাশি তিনি ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যরচনা ও অন্যান্য গদ্য রচনা করেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’ একটি পত্রোপন্যাস; ‘মৃত্যুক্ষুধা’ তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস এবং ‘কুহেলিকা’ তাঁর তৃতীয় ও শেষ উপন্যাস। ‘বাঁধনহারা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘মোসলেম ভারত’-এ এবং পরে শ্রাবণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে (১৯২৭) গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ‘কুহেলিকা’ও প্রথমে পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় ‘মৃত্যুক্ষুধা’ নজরুলের কথাসাহিত্যিক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।

উপন্যাসটির পটভূমি নজরুলের প্রত্যক্ষ জীবন-অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষ্ণনগরে বসবাস করেন। কৃষ্ণনগরের চাঁদসড়ক ও তার আশপাশের দরিদ্র মানুষের জীবন, বস্তির পরিবেশ, অভাব-অনটন এবং সামাজিক বাস্তবতা তাঁর দৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘মৃত্যুক্ষুধা’র কাহিনিতে সেই পরিবেশের প্রত্যক্ষ ছাপ রয়েছে। উপন্যাসের প্রথমাংশের রচনার সঙ্গে কৃষ্ণনগরের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক বিশেষভাবে লক্ষণীয়; পরবর্তী অংশ কলকাতায় অবস্থানকালে রচিত হয়।

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে দরিদ্র মানুষের এক সংকটময় জীবনজগৎ। অন্নের অভাব এখানে নিছক অর্থনৈতিক সমস্যা নয়—ক্ষুধা মানুষের প্রেম, নৈতিকতা, ধর্মবিশ্বাস, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক পরিচয় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। যে সমাজে মানুষের মৌলিক চাহিদাই পূরণ হয় না, সেখানে ধর্মীয় বিধিনিষেধ কিংবা সামাজিক নৈতিকতার প্রচলিত কাঠামো অনেক সময় নিপীড়নের আরেকটি হাতিয়ারে পরিণত হয়। নজরুল সেই বাস্তবতাকেই নির্মোহ দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন।

প্যাঁকালে এই জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অল্পবয়সি প্যাঁকালের ওপর একটি বৃহৎ পরিবারের ভরণপোষণের ভার। দারিদ্র্য তাকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও পারিবারিক দায়িত্ব পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। কুর্শির প্রতি তার আকর্ষণ, ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতি—এসবের মধ্য দিয়ে নজরুল দেখিয়েছেন, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে ধর্মান্তর কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়; প্রেম, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও জীবিকার সংকটের সঙ্গেও তা যুক্ত।

অন্যদিকে আনসার ও রুবির কাহিনি উপন্যাসটিকে আরও বিস্তৃত মানবিক ও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। আনসার দেশপ্রেমিক, সমাজসচেতন এবং সংসারবিরাগী এক চরিত্র। তার ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। রুবির সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রেমের পাশাপাশি সমাজের আরোপিত বিধিনিষেধের নির্মমতা প্রকাশ পেয়েছে। রুবির জীবন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বারবার সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও বৈধব্যের বিধিনিষেধের কাছে পরাজিত হয়। একজন নারী কীভাবে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারায়, নজরুল সেই প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে এনেছেন।

রুবির চরিত্রে নজরুল একই সঙ্গে প্রেম, প্রতিবাদ ও অসহায়তার জটিল সমন্বয় ঘটিয়েছেন। সমাজের চোখে তার পরিচয় একরকম হলেও তার অন্তর্জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিধবার ওপর আরোপিত সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, নারীর স্বাধীনতার সংকোচন এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দ্বৈত নৈতিকতা উপন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ কেবল দরিদ্র মানুষের উপন্যাস নয়; এটি নারীজীবনের সামাজিক বন্দিত্বেরও একটি শক্তিশালী দলিল।

উপন্যাসে ধর্মের প্রসঙ্গও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল নিজে ধর্মীয় সাম্য ও মানবিকতার প্রবক্তা ছিলেন। ‘মৃত্যুক্ষুধা’য় তিনি ধর্মবিশ্বাসকে আক্রমণ করার চেয়ে ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক বৈষম্য ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। দরিদ্র মানুষের জীবনে ধর্ম যখন আশ্রয়ের পরিবর্তে সামাজিক বিধিনিষেধের কারণ হয়ে ওঠে, তখন সেই ধর্মীয় কাঠামোর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই উপন্যাসটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মুসলিম ও খ্রিষ্টান চরিত্র, ধর্মান্তর, প্রেম এবং সামাজিক পরিচয়ের সংঘাতের মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নটি নানা মাত্রায় এসেছে।

‘মৃত্যুক্ষুধা’র রাজনৈতিক পটভূমিও উপেক্ষা করার মতো নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক দমন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা উপন্যাসের অন্তর্লীন বাস্তবতার অংশ। আনসারের মতো চরিত্রের মাধ্যমে নজরুল ব্যক্তিগত জীবন ও বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তবে এটি কোনো সরল রাজনৈতিক প্রচারপুস্তক নয়; রাজনৈতিক চেতনা এখানে চরিত্রগুলোর জীবন, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

উপন্যাসটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর শ্রেণিচেতনা। সমাজের উচ্চস্তরের জীবন এখানে প্রধান বিষয় নয়; বরং যাদের জীবন সাধারণত সাহিত্যের প্রান্তে থাকে—ক্ষুধার্ত, দরিদ্র, বিধবা, বস্তিবাসী ও সামাজিকভাবে অসহায় মানুষ—তাদের জীবনই কাহিনির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ক্ষুধা তাদের স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করে, সম্পর্ককে জটিল করে এবং নৈতিকতার প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এই কারণে ‘মৃত্যুক্ষুধা’কে বাংলা সাহিত্যে সাম্যবাদী ও শ্রেণিসচেতন ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নজরুলের নিজের জীবনও এই উপন্যাসের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, কলকাতা ও কৃষ্ণনগরের জীবন, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল। ‘মৃত্যুক্ষুধা’ সেই অভিজ্ঞতাজাত মানবিক ও প্রতিবাদী চেতনারই একটি কথাসাহিত্যিক প্রকাশ।

তবে ‘মৃত্যুক্ষুধা’কে কেবল রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক উপন্যাস হিসেবে দেখলে এর সাহিত্যিক ব্যাপ্তি খর্ব হয়। প্রেম, পারিবারিক সম্পর্ক, যৌনতা, ধর্ম, দারিদ্র্য, বৈধব্য, সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা—বহুস্তরীয় মানবিক সংকট এখানে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। নজরুল চরিত্রগুলোকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতিনিধি করেননি; তাদের দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা, দ্বিধা ও সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছেন। ফলে উপন্যাসের মানুষগুলো কেবল ‘চরিত্র’ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট সময় ও সমাজের জীবন্ত প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে।

ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গিতেও নজরুলের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। কবির কাব্যিক আবেগ তাঁর গদ্যেও উপস্থিত, কিন্তু ‘মৃত্যুক্ষুধা’র ভাষা অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ, তীক্ষ্ণ ও বাস্তবমুখী। দরিদ্র মানুষের কথ্যভাষা, সামাজিক পরিবেশের বিবরণ এবং চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েনকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে কাহিনির পরিবেশ পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোথাও ভাষা আবেগপ্রবণ, কোথাও ব্যঙ্গাত্মক, আবার কোথাও প্রতিবাদী—এই বৈচিত্র্য উপন্যাসটির নিজস্ব স্বর নির্মাণ করেছে।

‘মৃত্যুক্ষুধা’র গুরুত্ব শুধু তার সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অধিকার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন আজও সমাজে প্রাসঙ্গিক। ফলে উপন্যাসটি পাঠ করলে ১৯২০-এর দশকের বাংলার একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি মানবসমাজের কিছু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যারও মুখোমুখি হতে হয়।

নজরুলের কথাসাহিত্যের মধ্যে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি একদিকে ঔপনিবেশিক বাংলার দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রামের দলিল, অন্যদিকে প্রেম ও ব্যক্তিস্বাধীনতার কাহিনি; একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মানবিক প্রতিবাদ এবং সাম্যচেতনার সাহিত্যিক প্রকাশ। ক্ষুধার্ত মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এর মূল প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত মানুষের মর্যাদা ও মুক্তি নিয়ে। সেই কারণেই প্রকাশের বহু দশক পরেও ‘মৃত্যুক্ষুধা’ নজরুলের কথাসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং পাঠযোগ্য রচনা হিসেবে তার স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে।

লিখেছেন— তাহের আলমাহদী