সেদিন বড়-বৌ, প্যাঁকালে, তার মা আর পাঁচিতে মিলে একটা গোপন পরামর্শসভা বসেছিল।
প্যাঁকালের অতিমাত্রায উত্তেজিত হয়ে বললে, “আমি তা কখনও পারব না। আমি কালই চললাম রানাঘাট। সেখেনে রোজ চোদ্দো আনা করে পয়সা পাব।”
তার মা অনুনয়ের স্বরে বললে, “রাগ করিস কেন বাবা? এমন তো সব গরিব ঘরেই হচ্ছে আমাদের। তা ছাড়া ওর চাঁদপনা মুখ যে কিছুতেই ভুলতে পারিনে। অমন বৌ পর হয়ে যাবে। আমার কপালই যদি না পুড়বে তাহলে সোভানই বা মরবে কেন, আর তোকেই বা এ উপরোধ করতে যাব কেন?”
পাঁচি মায়ের কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল, “তা ভাই, তোমার এক আশ্চয্যি লজ্জা! অমন তো কতই হচ্ছে! একদিন ভাবি বলেছ বলে বুঝি আর ইয়ে করতে নেই! দু’দিন বাধবে, তা-পর আপনি সরগড় হয়ে যাবে দেখে নিও।”
প্যাঁকালে দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল, “তুই থাম পাঁচি। যা লয় তাই! তুই তবে কেনে নিকে করলিনে তোর ভাসুরকে?”
পাঁচি ছেলের মা হলেও তার ছেলেমানুষি করার বয়স আজও যায়নি। তার ভাসুরকে নিকে করার ইঙ্গিত শুনে সে একেবারে তেলে-বেগুনে হয়ে বলে উঠল, “তা ইখেনে নিকে করবে কেনে, কুর্শিকে যে বিয়ে করবে খেরেস্তান হয়ে!”
প্যাঁকালে রেগে উঠে যেতে যেতে বললে, “রইল তোর নিকে, আমি চললুম!” বলেই বেড়িয়ে গেল!
বড়-বৌ বললে, “তখনই বলেছিলাম মা, যে, এ হয় না। তা ছাড়া, তোমার ছেলে রাজি হলেও সে যা মেয়ে–সে কিছুতেই রাজি হত না।”
শাশুড়ি মস্ত বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললে, “কপাল মা, কপাল! কী করবি বল! ঐ বুড়ো মিনসেই ছিল ছুঁড়ির কপালে।” বলেই সোভানকে উদ্দেশ করে কান্না জুড়ে দিল।
বড়-বৌ একটু রেগেই বললে, “তোমারই মা বাড়াবাড়ি! জান যে মেজ-বৌ ও নিকেতে রাজি নয়, তবু ঐ নিয়ে দিনরাত কান্নাকাটি। তুমিই তাড়াবে এমনি করে মেজ-বৌকে!”
এমন সময় মেজ-বৌ তার বাপের বাড়ি থেকে এসে পৌঁছল। বড়-বৌ হেসে বললে, “কি লো, জোড়ে ফিরলি, না বিজোড়ে?”
মেজ-বৌ বড়-বৌর রহস্যের উত্তর না দিয়ে তিক্তকণ্ঠে বলে উঠল, “তা তোমরা যে-রকম করে তুলছ অবস্থা, তাতে জোড়াই খুঁজে নিতে হবে দেখছি আমায়।” বলেই শাশুড়ির দিকে চেয়ে বললে, “মাগো মা! পাড়ায় ঢি-ঢিক্কার পড়ে গেল এই নিয়ে! কেলেঙ্কারির আর বাকি রইল না! আচ্ছা মা, এমনি করে তুমি আমায় দেশ-ছাড়া করতে চাও নাকি? তুমি জান, আমার বোন বেঁচে রয়েছে আজও। এক বোন বেঁচে থাকতে আর এক বোনকে নিকে করা যায় কি-না, যাও মউলবি সায়েবকে জিজ্ঞেস করে এস?” বলেই দাওয়ায় বসে পড়ে পা দুলোতে লাগল। ছোট মেয়ে রাগলে যেমন করে।
বড়-বৌ খুশি হয়ে বলে উঠল, “ঠিক বলেছিস মেজ-বৌ। দেখ ও কথাটা আমাদের কারুর মনেই ছিল না যে, এক বোন থাকতে আর এক বোনকে নিকে করা যায় না। সত্যিই মেজ-বৌ, তোর-না জানা কিছু নেই দেখছি। আমাদের হাফেজ সাহেব হার মেনে যায় তোর কাছে।” বলেই মেজ-বৌ কোন দিন কোন বিষয়ে কী ফতোয়া দিয়েছিল, তারই সালঙ্কার বর্ণনা শুরু করে দিলে।
তার শাশুড়ির কিন্তু সন্দেহ আর ঘোচে না। সে কান্না থামিয়ে বলে উঠল, “তুই থাম বড়-বৌ, অমন এনেক দেখেছি। কত জনা আমাদের চোখের সামনে এক বোনকে তালাক দিয়ে আর এক বোন কে নিকে করল। ও মুখপোড়া মিনসের মেজ-বৌর বড় বোনকে তালাক দিতে কতক্ষণ?” বলেই কান্নার জের চালায়।
মেজ-বৌর খোকাটি রোজকার মত কান্না থামাতে যায়, “দাদি গো, চুপ কর।” মেজ-বৌ ছেলেকে হাত ধরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যায়। বলে, “তোর বাবা-কেলে দাদি! পোড়ামুখো! সব তাতেই ফফর দালালি।”
খোকা ছেলেবেলা থেকেই দাদি-ন্যাওটা! যত মার খায়, তত বলে, “ও দাদি গো, আমায় মেরে ফেললে।”
বৃদ্ধা বৌর কাছ থেকে ছেলে ছিনিয়ে নিয়ে মেজ-বৌর বাপ-মাকে গাল দিতে থাকে! তারপর আঁচল দিয়ে খোকার চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, “দেখ বড়-বৌ, সোভান ঠিক এমনটি দেখতে ছিল, ছেলেবেলায় ঠিক এমনি করে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদত! ঠিক তেমনি আওয়াজ।”
বড়-বৌ বলে, “ওর কপালের ঐখেনটা কিন্তু ওর বড় চাচার মত, লয় মেজ-বৌ?”
মেজ-বৌ কথা কয় না। দাওয়ায় বসে আনমনে পা দোলায় আর চাপাসুরে গান করে।
সেজ-বৌ পাশ ফিরে কাশতে থাকে। মনে হয়, ওর প্রাণ গলায় ঠেকেছে এসে। কবর দেবার জন্য বাঁশ কাটার শব্দটা যেমন ভীষণ করুণ শোনায়, তেমনই তার কাশির শব্দ।
তার পাশে শিশু আর কাঁদতেও পারে না, কেবল ধুঁকতে থাকে। যেন মৃত্যুর পাখার শব্দ।
এরি মধ্যে হঠাৎ একদিন একপাল ছেলেমেয়ে চিৎকার করতে করতে ঘরে এসে বললে, “ওগো, তোমাদের বাড়িতে পাদরি সায়েব আর মেম আসছে!” বাড়িসুদ্ধ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল! সত্যি-সত্যিই একজন পাদরি সায়েব, সঙ্গে একজন নার্স নিয়ে ঘরে ঢুকল এসে। বৌ-ঝিরা ঘরে ঢুকে পড়ল। শুধু প্যাঁকালের মা হতভম্বের মত চেয়ে রইল সায়েবের মুখের দিকে।
সায়েব বাংলা ভালই বলতে পারে। বললে, “টোমরা ভয় করবে না। হামি টোমাদিগের কষ্ট শুনিয়া আসিয়াছে। টোমাডের কে পীরিট আছে, টাহাকে ঔষড ডিবে!”
প্যাঁকালের মা একটু মুশকিলেই পড়ল প্রথমে। পরে আমতা আমতা করে বললে, “খোদা তোমার ভাল করবেন সায়েব। ঐ আমার বৌ আর তার খোকা শুয়ে। দেখো, যদি ভাল করতে পার। কেনা হয়ে থাকব তাহলে?”
সায়েব খুশি হয়ে বললে, “কোন চিন্টা নাই। যীশু বালো করিয়ে ডেবে। যীশুকে প্রার্ঠনা কর।” তারপর এগিয়ে মাটিতেইতে বসে পড়ে শিশুকে পরীক্ষা করতে লাগল। সাহেব একজন ভাল ডাক্তার।
নার্সকে ইংরেজিতে কী ইঙ্গিত করে সায়েব বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। মুখ তার বিষণ্ণ গম্ভীর।
নার্স সেজ-বৌকে পরীক্ষা করতে লাগল। নার্সের পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর দুজনে বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বলা-কওয়া করলে কিসব। তারপর প্যাঁকালের মাকে ডেকে কতকগুলো ওষুধ দিয়ে খাওয়াবার সময় ইত্যাদি সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে চলে গেল। বলে গেল, আবার এসে দেখে যাবে বিকালে।
প্যাঁকালের মা খুশিতে প্রায় কেঁদে ফেললে। বললে, “ছুঁড়ির কপাল ভাল মেজ-বৌ, এত ওষুধ খেয়েও কি আর মরে? হেদে দেখ, কতকগুলোন ওষুধ দিয়েছে।”
মেজ-বৌ বললে, “মেম সায়েব যাওয়ার বেলায় একটা টাকা দিয়ে গেছে সেজ-বৌর পথ্যি কিনতে। বলেছে, বেদানার রস খাওয়াতে।” বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জলের ফোঁটা ঝরে পড়তে লাগল। মেজ-বৌ কাঁদতে লাগল, “কপালে এত দুখ্যুও লিখেছিলেন আল্লা। সেজ-বৌর যাওয়ার সময়ও ঘরের পয়সায় কিনে দুটো আঙুর কি একটা বেদনা দিতে পারলুম না! শুকিয়ে মরলেও কেউ শুধোয় না এসে। ঝ্যাঁটা মার নিজের জাতের মুখে, গেঁয়াতকুটুমের মুখে। সাধে সব খেরেস্তান হয়ে যায়!”
শাশুড়ি কেঁদে বলে, “যা বলেছিস মা!”