বহুদিন ধরে ঐতিহাসিকরা বলার চেষ্টা করছেন যে ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার যে-সংঘর্ষ (১৭৫৬-৫৭) বাধে, তার জন্য মূলত দায়ী নবাব সিরাজদ্দৌল্লাই। এই মতের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা এস. সি. হিল (S. C. Hill, 1905), যদিও এই বক্তব্যই বেশ চাতুর্যের সঙ্গে এবং খুব সূক্ষ্মভাবে (সোজাসুজি নয়) অধুনাতম গ্রন্থেও পরিবেশিত হয়েছে। উক্ত সংঘর্ষের কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে হিল বলছেন, সিরাজদ্দৌল্লার ‘আত্মম্ভরিতা’ (vanity) এবং ‘অর্থলিপ্সাই’ (avarice) এ সংঘর্ষের মুখ্য কারণ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাবের যে কতগুলি নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল, হিল সাহেব সেগুলিকে ‘ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য’ নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ বলে নস্যাৎ করে দিচ্ছেন।[১]নবাব হওয়ার আগে হয়তো সিরাজদ্দৌল্লা কিছুটা দাম্ভিক ছিলেন কিন্তু নবাব হওয়ার পরে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর আচরণে বা সম্পর্কে এমন কোনও ঘটনা বা তথ্য দেখানো মুশকিল যাতে প্রমাণিত হয় যে সিরাজের দাম্ভিকতাই ইংরেজের সঙ্গে তাঁর বিরোধের অন্যতম কারণ। আর খোদ ইংরেজ কর্মচারীদের লেখা থেকেই সহজে দেখানো যায় যে সিরাজের অর্থলিপ্সা যদি থেকেও থাকে, তা কিন্তু কোনওভাবেই এ-সংঘর্ষের জন্য দায়ী নয়। অন্যদিকে আমাদের কাছে এমন তথ্যপ্রমাণ আছে যা থেকে দেখানো যাবে যে, যদি কোনও একটি কারণকে এ-সংঘর্ষের জন্য দায়ী করা যায় তবে তা হল কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানির গভর্নর রজার ড্রেকের (Roger Drake) কঠিন ও অনমনীয় মনোভাব। হিল কিন্তু এ-সংঘর্ষে ড্রেকের ভূমিকা সম্বন্ধে আশ্চর্যরকমের (সুবিধেজনকও বটে) নীরব!
অধুনা ঐতিহাসিকদের মধ্যে যদিও পিটার মার্শাল বলছেন যে, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল নবাবের সঙ্গে ‘মিটমাট করার জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থা নেয়নি’ তবু তিনি এবং অন্যান্যরা এখনও প্রচ্ছন্নভাবে এ-সংঘর্ষের জন্য সিরাজদ্দৌল্লাকেই বেশি করে দায়ী করেছেন।[২]
ইদানীং ঐতিহাসিকরা বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে বিরোধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলার চেষ্টা করছেন যে, অষ্টাদশ শতকের প্রথম থেকে বাংলায় নবাবের সঙ্গে সামরিক অভিজাতশ্রেণী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও জমিদারদের মধ্যে যে নতুন শ্রেণীগত জোটবদ্ধতা (new class alliance) তৈরি হয়েছিল এবং যা মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি খান পর্যন্ত বাংলায় নবাবি শাসনের মূল ভিত্তি, সিরাজদ্দৌল্লার সময় তা ভেঙে পড়ে।[৩] তার ফলেই তরুণ নবাবের সময় বাংলার রাজনৈতিক জীবনে ‘সংকট’ ঘনীভূত হয়। আর সেই সুযোগেই ইংরেজরা বাংলায় নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়। এটা ঠিকই, ১৭৫৬-৫৭ সালে বাংলায় যে ‘সংকটে’র কথা বলা হয় তা সম্যক উপলব্ধি করতে গেলে, বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে যে-সম্পর্ক তা ভাল করে বুঝতে হবে। এ-সম্পর্ক আবার অনেকটা নির্ভর করত একদিকে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির নিজস্ব অর্থাৎ কোম্পানির তরফে যে-সব ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যদিকে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার সমৃদ্ধি বা অবনতির ওপর। কিন্তু যে-সব বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে সংঘর্ষের উৎপত্তি, সেগুলি ভাল করে বিশ্লেষণ করা দরকার, যাতে এ-সংঘর্ষের প্রকৃত কারণগুলি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।
কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির অধ্যক্ষ জাঁ ল’ লিখেছেন যে নবাব আলিবর্দি খানের মৃত্যুর আগে থেকেই ইংরেজদের প্রতি সিরাজদ্দৌল্লার বিরূপ মনোভাব ছিল।[৪] কিন্তু এ বক্তব্য মোটেই সঠিক নয়। এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সিরাজদ্দৌল্লা যখন নবাব হলেন, তখনও ইংরেজদের প্রতি তাঁর কোনও বিরূপতা ছিল না, কোনও শত্রুতামূলক মনোভাবও নয়। সাধারণভাবে ইউরোপীয়দের প্রতি, ইংরেজসমেত, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলিবর্দির মতোই। দু’জনেরই এদের প্রতি মনোভাব দক্ষিণ ভারত এবং কর্ণাটকের ঘটনার প্রেক্ষিতেই আবর্তিত হত। দক্ষিণ ভারতে যা ঘটছিল, সেখানে কীভাবে ইংরেজ ও ফরাসিরা রাজনীতির দাবাখেলায় মেতে উঠেছিল এবং কীভাবে স্থানীয় শাসকদের তাদের হাতের পুতুল করে তুলছিল, সে সম্বন্ধে আলিবর্দি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁর ভয় ছিল, ইউরোপীয়রা বাংলায়ও সে-খেলায় মেতে উঠতে পারে। তাই তারা যাতে বাংলায় তার পুনরাবৃত্তি করতে না পারে তার জন্য তিনি সচেষ্ট ও বদ্ধপরিকর ছিলেন।[৫] জাঁ ল’ বলছেন, আলিবর্দি ইংরেজ ও ফরাসিদের সমান সন্দেহের চোখে দেখতেন। তবে বৃদ্ধ নবাব বুঝতে পেরেছিলেন যে বাংলায় ফরাসিদের তুলনায় ইংরেজদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অনেক বেশি ছিল— সুতরাং ফরাসিদের চেয়ে তারাই বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।[৬] সিরাজদ্দৌল্লার উপলব্ধিও ছিল তাই। এটা এক অজ্ঞাতনামা ইংরেজ লেখকের পাণ্ডুলিপি থেকে সুস্পষ্ট: ‘নতুন নবাব তাঁর রাজ্যে ইউরোপীয়দের শক্তিবৃদ্ধিতে শঙ্কিত বোধ করছিলেন এবং তা হ্রাস করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। এদের মধ্যে যেহেতু ইংরেজরাই বেশি শক্তিশালী, তাই তিনি ন্যায্যভাবে [just policy] প্রথমে তাদের দমন করতে অগ্রসর হলেন।’[৭]
হলওয়েল (Holwell) অবশ্য লিখেছেন যে আলিবর্দি অনেকদিন ধরে ইউরোপীয়দের অস্ত্রসম্ভার ও দুর্গ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছিলেন এবং মৃত্যুশয্যায় সিরাজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইংরেজদের প্রথম শায়েস্তা করতে এবং তাদের কোনও দুর্গ বা সৈন্যসামন্ত রাখতে না দিতে।[৮] কিন্তু হলওয়েলের দেওয়া তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। কলকাতার ‘অন্ধকূপ হত্যার’ যে-কাহিনী তার জনক তিনিই। তাঁর সত্যবাদিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্বন্ধে অনেক ইংরেজ কর্মচারীই সন্দিহান ছিল। নিজের বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য মিথ্যা ও ভুল তথ্য পরিবেশন করতে বা তথ্যকে বিকৃত করতে তিনি বেশ অভ্যস্ত ছিলেন। অন্য ইংরেজ কর্মচারীদের লেখা থেকে প্রমাণ করা যায় যে আলিবর্দির মৃত্যুশয্যায় সিরাজের প্রতি নির্দেশ একেবারেই আজগুবি গল্প। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির প্রধান উইলিয়াম ওয়াটস, যিনি মুর্শিদাবাদ দরবারের হাঁড়ির খবরও রাখতেন, জানিয়েছেন যে তিনি বা ওই কুঠির কেউ, এমনকী স্থানীয় লোকজনরাও মৃত্যুশয্যায় আলিবর্দির সিরাজের প্রতি নির্দেশের কথা শোনেননি।[৯] ওই কুঠির দ্বিতীয় প্রধান ম্যাথু কোলেট (Mathew Collet) হলওয়েলের বক্তব্যকে ‘একেবারেই আজগুবি গল্প’ (spacious fable) আখ্যা দিয়েছেন।[১০] এখানে স্মর্তব্য, এঁরা দুজনেই কাশিমবাজারে ছিলেন বলে পাশে মুর্শিদাবাদ দরবারে রোজ যা ঘটত, তার সবকিছুরই খবর রাখতেন। তাঁরা কিছু জানতেন না অথচ হলওয়েল কলকাতায় বসে কী করে সব জানলেন? ইংরেজ কোম্পানির আরেকজন কর্মচারী, রিচার্ড বেচার (Richard Becher) লিখেছেন: ‘ইংরেজরা এমন অনেক কাজ করেছে যার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের ওপর রেগে গেছিলেন। তাদের প্রতি বিরূপ হওয়ার জন্য আলিবর্দির শেষ উপদেশের কোনও প্রয়োজনই ছিল না।[১১]
আগেই বলা হয়েছে প্রথমদিকে সিরাজ ইংরেজদের প্রতি একেবারেই শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন না। সিরাজ মসনদে বসার অনেক আগেই আলিবর্দি ইংরেজদের দেওয়া এক পরোয়ানায় জানিয়েছিলেন যে, সিরাজদ্দৌল্লা সবসময় আলিবর্দির সমক্ষে ইংরেজদের প্রশংসা করতেন এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য শুভকামনা করতেন।[১২] ১৭৫২ সালের মে মাসে আলিবর্দি সিরাজদ্দৌল্লাকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন আর ওই বছরের সেপ্টেম্বরেই হুগলির ফৌজদার ও আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদের পরামর্শে ইংরেজরা সিরাজের সঙ্গে দেখা করেন। ফোর্ট উইলিয়ামের নথিপত্র থেকে জানা যায়, সিরাজ ‘ইংরেজদের প্রতি ডাচ বা ফরাসিদের চেয়েও বেশি সৌজন্য দেখান এবং যথেষ্ট হৃদ্যতামূলক আচরণ করেন।’[১৩] নবীন যুবরাজের সহৃদয় ব্যবহারের খবর পেয়ে কোম্পানির পরিচালক সমিতি লন্ডন থেকে ফোর্ট উইলিয়ামে লিখে পাঠায় (২৩ জানুয়ারি ১৭৫৪) যে ‘তারা যেন ইংরেজদের প্রতি সিরাজদ্দৌল্লার এই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের সুযোগ নিয়ে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের আরও উন্নতি করে।’[১৪] আবার আরেকটি চিঠিতে পরিচালক সমিতি জানাচ্ছে (২৪ নভেম্বর, ১৭৫৪), সিরাজ অন্য ইউরোপীয়দের চেয়ে ইংরেজদের প্রতি অনেক বেশি প্রসন্ন বলে মনে হচ্ছে এবং এটাকে যেন কাজে লাগানো হয়।[১৫]
সাধারণভাবে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে সিরাজ নবাব হওয়ার পর তখনকার রীতি অনুযায়ী ইংরেজরা তাঁকে কোনও নজরানা বা উপঢৌকন দেয়নি বলে তিনি ইংরেজদের ওপর অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু এটা বোধহয় ঠিক নয়। ইংরেজরা একটি চিঠি লিখে সিরাজকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং নতুন নবাবের কাছ থেকে অনুগ্রহ ও নিরাপত্তার আশ্বাস চেয়েছিলেন। এ চিঠি বেশ সাদরেই গৃহীত হয়েছিল। তরুণ নবাব দরবারে ইংরেজদের ‘ভকিল’ (vakil) বা প্রতিনিধিকে জানিয়ে দেন যে তিনি ইংরেজদের প্রতি তাঁর মাতামহ আলিবর্দির চেয়েও বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করবেন।[১৬] আসলে ইউরোপীয়দের প্রতি আলিবর্দির নীতি ছিল ‘ঋজু অথচ অন্যায্য নয়’ (rigid rather than unjust)। যাতে তাঁর প্রবল আপত্তি ছিল তা হল, ইউরোপীয়রা নবাবের অধীন নয়—স্বাধীন, নবাবের তারা তোয়াক্কা করে না এমন মনোভাব। জাঁ ল’ জানাচ্ছেন, ‘আলিবর্দি কিন্তু ভালভাবেই জানতেন ঠিক কখন এবং কীভাবে এদের সমঝে দেওয়া প্রয়োজন যে তিনিই বাংলার হর্তাকর্তা। তিনি চেয়েছিলেন যে ইউরোপীয়রা কেউই বাংলায় দুর্গ তৈরি করে নিজেদের সুসংহত না করে।’[১৭] তিনি দরবারে এ-সব কোম্পানির প্রতিনিধিদের বলতেন—‘তোমরা সওদাগর, তোমাদের দুর্গ তৈরি করার প্রয়োজনটা কী? আমার রাজ্যে তোমাদের এমন কোনও শত্রু নেই যাকে তোমরা ভয় করতে পার।’ তিনি আরও বলছেন, ‘আলিবর্দি যদি আর কিছুদিন সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকতেন, তা হলে তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউরোপীয়দের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এত বৃদ্ধ ও এমন অসুস্থ ছিলেন যে তাঁর উত্তরসূরিকেই সেই কাজ করতে এগিয়ে আসতে হল।’[১৮] সিরাজদ্দৌল্লা প্রথম থেকেই ইউরোপীয় এবং ইংরেজদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিলেন। জাঁ ল’ লিখেছেন, সিরাজ ফরাসিদের প্রতি বেশ সন্তুষ্টই ছিলেন। তারাও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে রায়দুর্লভ ও মোহনলালের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলত।[১৯]
কিন্তু সিরাজদ্দৌল্লার নবাব হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে, দু’পক্ষের স্বার্থের মধ্যে সংঘাতের ফলে, বিরোধ অপরিহার্য হয়ে উঠল। আসলে আলিবর্দির মৃত্যুর ঠিক আগে সিরাজ ইংরেজদের কিছু কাজকর্মের প্রতিবাদ করেছিলেন কারণ এগুলির মাধ্যমে নবাবের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছিল। ইউরোপে যুদ্ধ বাধার আশঙ্কায় এবং আলিবর্দির মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদে মসনদ নিয়ে বিরোধ অবধারিত ভেবে ইংরেজ ও ফরাসিরা উভয়েই প্রায় প্রকাশ্যে তাদের দুর্গগুলি সংস্কার ও সংহত করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু একদিকে আলিবর্দি অত্যন্ত অসুস্থ এবং অন্যদিকে দিল্লি থেকে মুঘল সম্রাটের প্রধানমন্ত্রী বাংলার বকেয়া রাজস্ব আদায় করতে অভিযান করবে এমন আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সিরাজ আপাতত ইংরেজ ও ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা মুলতুবি রাখতে বাধ্য হলেন।[২০]
সিরাজদ্দৌল্লার ইংরেজদের প্রতি বিরূপ হওয়ার আরও গভীর কারণ ছিল। তিনি আশঙ্কা করেন যে ইংরেজরা তাঁর সিংহাসন প্রাপ্তির বিরোধিতা করতে পারে। তিনি যখন ১৭৫৬-এর এপ্রিলে নবাব হলেন তখন তাঁর সন্দেহ হয় যে ইংরেজরা মসনদে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মদত দিচ্ছে। এ-সন্দেহ কিন্তু একেবারে অমূলক নয়। বস্তুত ইংরেজরা প্রথম থেকে প্রায় ধরেই নিয়েছিল, সিরাজের পক্ষে নবাব হওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলায় ফরাসি কোম্পানির প্রধান রেনল্ট বা জা ল’র লেখা থেকে এবং অন্যান্য বেশ কিছু ইউরোপীয় তথ্য থেকেও জানা যায় যে ইংরেজরা সিরাজের বিরুদ্ধে একটা মতলব ভাঁজছিল এবং সিরাজের বিরুদ্ধ-গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। রেনল্ট স্পষ্ট জানাচ্ছেন, ‘ঘসেটি বেগমের দলকে মসনদ দখলের দৌড়ে কেউ আটকাতে পারবে না এবং সিরাজদ্দৌল্লার পতন অনিবার্য, এই স্থির বিশ্বাসে ইংরেজরা ঘসেটি বেগমের সঙ্গে [সিরাজের বিরুদ্ধে] চক্রান্ত শুরু করেন।’[২১] জাঁ ল’-ও লিখছেন যে অন্য অনেকের মতো ইংরেজরাও ভেবেছিল, ‘সিরাজদ্দৌল্লা কখনও নবাব হতে পারবেন না, এবং তাই তারা কোনও কাজে তাঁর দ্বারস্থ হত না। শুধু তাই নয়, তারা তাঁর সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগই রাখত না।’ এ-সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য:
it was in the effervescence of these troubles that the English gave Siraj-uddaula reason for complaint against them. Always led away by the idea that he would not have sufficient influence to get himself recognised as subahdar they carried on a correspondence with the Begum (Ghaseti)…. It is even said that they had an understanding with the Nawab of Purnea (Shaukat Jung).[২২]
ইংরেজরা যে সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিল তা অন্য একটি ফরাসি সূত্র থেকেও জানা যায়। তাতে বলা হয়েছে যে, লেখকের বিশ্বাস, ইংরেজরা ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের সঙ্গে সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তে যোগ দেয়।[২৩] এখানে উল্লেখ্য, শওকত জঙ্গও ঘসেটি বেগমের মতো মসনদের দাবিদার হিসেবে সিরাজের প্রতিপক্ষ ছিলেন। হলওয়েল নিশ্চিত ছিলেন যে সিরাজের বিরুদ্ধে ঘসেটি বেগমের জেতার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল।[২৪] এমনকী ইংরেজ গভর্নর ড্রেকও যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে সিরাজদ্দৌল্লা ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে সফল হতে এবং আদৌ নবাব হতে পারবেন কি না।[২৫] সিয়র-উল-মুতাখারিনে-র লেখক ও শওকত জঙ্গের পরামর্শদাতা গোলাম হোসেন খান সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য শওকত জঙ্গকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন।[২৬] কোম্পানির কর্মচারী রিচার্ড বেচার লিখেছেন যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে তাদের ওপর রেগে যাওয়ার যথেষ্ট ইন্ধন জুগিয়েছিল।[২৭]
ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজদ্দৌল্লার নির্দিষ্ট অভিযোগগুলি যথার্থ কি না তা বিচার করার আগে তাঁর আত্মম্ভরিতা ও অর্থলিপ্সা, যা সিরাজ-ইংরেজ সংঘর্ষের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তার দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। সিরাজ যদি সত্যিই দাম্ভিক হতেন এবং তাঁর দাম্ভিকতাই যদি বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে থাকে, তা হলে তাঁর দুই প্রবল শত্রু ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গকে পরাভূত করার পরই তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। মসনদে বসার ক’দিন পরে তিনি রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে তাঁর হাতে অর্পণ করার অনুরোধ জানিয়ে কলকাতায় চিঠি দেন। কৃষ্ণদাস ৫৩ লক্ষ টাকা মূল্যের ধনসম্পদ নিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। খুব সম্ভবত তাঁর পিতা রাজবল্লভ ইংরেজদের যোগসাজশে ওই ধনসম্পদ সমেত তাঁকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমের বিশ্বস্ত অনুচর—তাঁর মৃত স্বামী নওয়াজিস মহম্মদ ঢাকার নবাব থাকার সময় রাজবল্লভ প্রথমে একজন সহকারী ছিলেন, পরে তিনি ঢাকার রাজস্ববিভাগের দায়িত্ব পান। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তহবিল আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছিল এবং যখন এ-সব হিসেবপত্র পরীক্ষার কাজ চলছিল, তখন রাজবল্লভ ইংরেজদের কাছে তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাস ও পরিবারের জন্য কলকাতায় আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কৃষ্ণদাস কলকাতা পৌঁছোন ১৩ মার্চ ১৭৫৬—আলিবর্দির মৃত্যুর প্রায় মাসখানেক আগে।[২৮]
কয়েক সপ্তাহ পরে, সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর ইংরেজদের লিখে পাঠান, ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লাকে সুসংহত ও দুর্ভেদ্য করার জন্য যেন নতুন করে কিছু করা না হয় এবং ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়ামে যে প্রাচীর ও অপসারণীয় সেতু (draw bridge) সম্প্রতি বানিয়েছে তা যেন ভেঙে ফেলা হয়। ইংরেজ গভর্নর ড্রেক সিরাজের চিঠিকে শুধু উপেক্ষাই করেননি, পত্রবাহক মেদিনীপুরের ফৌজদার রাজারামের ভাই নারায়ণ সিংকে ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশকারী ও গুপ্তচর অপবাদ দিয়ে কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দেন।[২৯] অথচ তখনকার কলকাতার সবচেয়ে ধনী ও সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী উমিচাঁদই নারায়ণ সিংকে পরিচয়পত্র দিয়ে ড্রেকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সিরাজদ্দৌল্লার দ্বিতীয় চিঠির উত্তরে ড্রেক যা লিখেছিলেন তাতে ইউরোপের সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ যদি ভারতবর্যে বিস্তার লাভ করে, সেক্ষেত্রে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নবাবের সাধ্যে কুলোবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।[৩০] এ-চিঠি পেয়ে সিরাজের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হল যে ইউরোপীয়রা, বিশেষ করে ইংরেজরা, দক্ষিণ ভারতে মাত্র কয়েক বছর আগে যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করেছিল, বাংলায় তারা তার পুনরাবৃত্তি করতে পারে। নারায়ণ সিং-এর কলকাতা থেকে বহিষ্কারের খবর পেয়ে ওয়াটস শঙ্কিত হয়ে লিখেছেন: ‘যে মুহূর্তে আমি নারায়ণ সিং-এর ব্যাপারটি জানতে পারলাম, তখনই আমি নবাবের উচ্চপদাধিকারী এই কর্মচারীকে এভাবে অপমান করার ফল কী হতে পারে তা ভেবে আতঙ্কিত হলাম কারণ তরুণ নবাবকে ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে কিঞ্চিৎ বেসামাল মনে হয় এবং তাঁর প্রত্যাশা তাঁর আদেশ লোকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেবে।’[৩১] জাঁ ল’-ও জানাচ্ছেন যে ‘ইংরেজরা নবাবের দূতকে অপমান করেছে এবং নবাবের চিঠির উত্তরে বেশ চড়া (offensive) জবাব দিয়েছে।’[৩২] হুগলির ডাচ কুঠির কুঠিয়ালরাও লিখেছেন যে নবাবের মতো শক্তিশালী বিপক্ষকে ‘এমনভাবে সোজাসুজি অগ্রাহ্য করে [ইংরেজরা] হঠকারিতার পরিচয় দিয়েছে।’[৩৩]
বস্তুতপক্ষে পুর্ণিয়া রওনা হওয়ার (১৬ মে ১৭৫৬) আগে সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের মতো ফরাসিদেরও আলিবর্দির শেষ অসুস্থতার সুযোগে তাদের কেল্লার সংস্কার ও সংহত করার জন্য যে-সব নির্মাণকার্য করেছিল, সেগুলি ভেঙে ফেলতে বলেন। ফরাসিরা জাঁ ল’-র পরামর্শে, ইংরেজদের মতো ঔদ্ধত্য না দেখিয়ে, নবাবের পত্রবাহককে বেশ সৌজন্য দেখায় এবং তাকে দিয়ে রিপোর্ট করায় যে ফরাসিরা বেআইনি কিছু করেনি। নবাব ২০ মে নাগাদ রাজমহলে এ-খবর পেয়ে বেশ সন্তুষ্ট হন।[৩৪] এদিকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল বুঝতে পারে নারায়ণ সিংকে কলকাতা থেকে ওভাবে বহিষ্কার করার ফলে নবাবের সঙ্গে সম্পর্কে বেশ তিক্ততার সৃষ্টি হতে পারে। তাই কাশিমবাজারে ওয়াটসকে নির্দেশ দেওয়া হল, তা যেন না হয় তার জন্য আগে থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে। ওয়াটস তড়িঘড়ি দরবারে নবাবের ঘনিষ্ঠ লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।[৩৫] কিন্তু আমরা আগেই বলেছি, ড্রেকের চিঠিতে সম্ভাব্য ফরাসি আক্রমণের বিরুদ্ধে নবাব ইংরেজদের রক্ষা করতে পারবেন কি না তা নিয়ে নবাবের ক্ষমতার ওপর কটাক্ষপূর্ণ ইঙ্গিত ছিল এবং মনে হয় সিরাজ তাতে খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। আবার এমন একটা সময় এ-সব ঘটনা ঘটল যখন সিরাজদ্দৌল্লা তাঁর এক প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী, ঘসেটি বেগমকে, কাবু করে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী শওকত জঙ্গের সঙ্গে মোকাবিলা করতে যাচ্ছিলেন। ফলে, অন্য সময় এ-সব ঘটলে সিরাজের ওপর যা প্রতিক্রিয়া হত, সে-সব এ সময় ঘটায় তার প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি জোরালো হয়ে দেখা দিল।[৩৬]
এর পরের যে ঘটনাবলী তার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সিরাজদ্দৌল্লা এতসব সত্ত্বেও দম্ভসূচক বা হঠকারিতার কোনও কাজ করেননি। তিনি তাঁর দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও অমাত্যদের ডেকে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্বন্ধে পরামর্শ চাইলেন। মুজাফ্রনামা-র লেখক করম আলির তথ্য অনুযায়ী, সিয়রে-র লেখক গোলাম হোসেন, জয়নাল আবেদিন, মীর্জা হাবিব বেগ, মীর হাসাউল্লা প্রমুখের নেতৃত্বে একদল পরামর্শ দিল, ইংরেজদের না ঘাঁটাতে, তারা ‘আগুনের শিখার মতো’ (‘flames of fire’), অন্যদিকে খোজা ওয়াজিদ, রায়দুর্লভ, মীরজাফর প্রমুখের নেতৃত্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী পরামর্শ দিল, ইংরেজদের প্রতি ‘দৃঢ় কূটনীতির সঙ্গে প্রয়োজনে অস্ত্রধারণের নীতি’ (‘a policy of firmness and diplomacy combined with a show of force’) অবলম্বন করতে।[৩৭] সেই (দ্বিতীয়) পরামর্শ অনুযায়ী সিরাজদ্দৌল্লা প্রখ্যাত আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদকে ইংরেজদের সঙ্গে আপস-মীমাংসার দৌত্যে নিযুক্ত করলেন। ওয়াজিদের নিযুক্তি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মিটিয়ে নেবার জন্য তরুণ নবাবের সদিচ্ছারই প্রমাণ। এই দৌত্যের কাজে ওয়াজিদই যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন সন্দেহ নেই, কারণ এই আর্মানি বণিক তখন বাংলার অগ্রণী ব্যবসায়ীদের অন্যতম এবং ইংরেজ সমেত ইউরোপীয়দের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ওয়াজিদের দৌত্য নিষ্ফল হল। ইংরেজ গভর্নর ড্রেক তাঁর সঙ্গে অপমানসূচক ব্যবহার করেন এবং তাঁকে কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দেন। উইলিয়াম ওয়াটসের লেখা থেকে জানা যায়, ওয়াজিদ চার বার কলকাতায় ইংরেজদের সঙ্গে দেখা করে নবাবের সঙ্গে একটা মিটমাটের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ইংরেজরা তাঁকে এই বলে শাসিয়েছিল যে এরকম প্রস্তাব নিয়ে ওয়াজিদ যেন আর কলকাতায় আসার চেষ্টা না করেন।[৩৮] এমনকী বাংলায় প্রুশীয় (Prussian) কোম্পানির প্রধান জন ইয়াং (John Young) নবাব ও বাংলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ইংরেজদের প্রতি ক্ষোভের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন:
[ইংরেজদের সঙ্গে] মিটমাটের জন্য যখন ফখর-উৎ-তুজ্জার [ওয়াজিদ] গেছলেন বা তাঁকে পাঠানো হয়েছিল—কোনটা আমি ঠিক জানি না, কতবার তাও না—তখন আপনারা [ইংরেজরা] নাকি কোনও কথায় কর্ণপাত করতে বা কোনও কিছু মেনে নিতে একেবারে অনিচ্ছুক ছিলেন। উপরন্তু আপনারা নাকি তাঁকে এ-কাজে আবার না আসার জন্য শাসিয়েছিলেন।[৩৯]
খোজা ওয়াজিদ যখন নিষ্ফল দৌত্যে ব্যস্ত, সিরাজদ্দৌল্লা তখন দুর্লভরাম ও হাকিম বেগকে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি অবরোধ করার জন্য নির্দেশ দিয়ে শওকত জঙ্গের বিরুদ্ধে অভিযান করার জন্য পুর্ণিয়া অভিমুখে রওনা হন।[৪০] কিন্তু রাজমহল পৌঁছে ইংরেজদের উদ্ধত আচরণের, ড্রেকের চিঠির এবং নারায়ণ সিং-এর প্রতি দুর্ব্যবহারের খবর পেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তড়িৎগতিতে কাশিমবাজারের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতিমধ্যে, ২৪ মে তিনশোর মতো নবাবের সৈন্য কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির সামনে উপস্থিত হয়। সিরাজদ্দৌল্লা কাশিমবাজার পৌঁছলেন ৩ জুন, তখন তাঁর সৈন্যসংখ্যা ৩০,০০০।[৪১] ৪ জুন কাশিমবাজারের ইংরেজকুঠি বিনা প্রতিরোধে নবাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। কুঠির প্রধান উইলিয়াম ওয়াটস সিরাজের নির্দেশে এক চুক্তির শর্তাবলীতে স্বাক্ষর করলেন। এই শর্তগুলি হল: (১) নবাবের কোনও অপরাধী প্রজাকে কলকাতায় আশ্রয় দেওয়া চলবে না (২) ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়ামে পেরিনের উদ্যানে যে দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও অপসারণীয় সেতু (draw bridge) তৈরি করেছে, তা ভেঙে দিতে হবে (৩) এশীয়/ভারতীয় বণিকদের কাছে ইংরেজরা দস্তক বিক্রি করতে পারবে না।[৪২] এ থেকে পরিষ্কার, শর্তগুলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাবের নির্দিষ্ট অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে রচিত—অভিযোগগুলি আমরা পরে খতিয়ে দেখব। কাশিমবাজারের পতনের পর সিরাজদ্দৌল্লা ৫ জুন কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর নির্দেশে কাশিমবাজার কুঠির ওয়াটস এবং কোলেটও নবাবের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে কলকাতা চললেন। সিরাজ কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া আর কিছুতে হাত দেননি বা বাজেয়াপ্ত করেননি—কোনও লুঠতরাজ বা হত্যাকাণ্ড হয়নি। কোনও নিষ্ঠুরতাও নয়।[৪৩]
এ পর্যন্ত ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার সম্পর্কে তাঁর কোনও দাম্ভিকতা বা ঔদ্ধত্যের পরিচয় পাওয়া যায় না। কলকাতা আক্রমণ করার আগে (১৬ জুন) সিরাজ আপস-মীমাংসার জন্য ইংরেজদের অনেক সময় দিয়েছিলেন, প্রথমে অস্ত্রধারণ না করে শুধু কূটনীতি ও দৌত্যের মাধ্যমে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে মিটমাটের চেষ্টা করেছিলেন। তা যখন ব্যর্থ হল, তখনই তিনি একদিকে দৌত্য এবং অন্যদিকে অস্ত্রধারণ করলেন। কাশিমবাজার কুঠি অবরোধ করার পেছনে বোধহয় সিরাজের উদ্দেশ্য ছিল, ওখানে ইংরেজদের নিরস্ত্র করে ওই কুঠির প্রধান ওয়াটসের মাধ্যমে কলকাতায় ইংরেজদের ওপর নবাবের সঙ্গে মিটমাট করে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা। ওয়াটসের সঙ্গে চুক্তির যে শর্তাবলী, সেগুলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগের ওপর ভিত্তি করা এবং মোটেই অযৌক্তিক কিছু নয়। তা ছাড়া এরকম ক্ষেত্রে ইউরোপীয় কোম্পানির কুঠি অবরোধ করা নতুন কিছু নয়, সিরাজের আগের নবাবরাও তা করেছেন। কাশিমবাজার কুঠির অবরোধ সম্বন্ধে রিচার্ড বেচারের মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
That he [Siraj] must have been greatly incensed somehow or other is certain; he had proceeded as far as Rajamahall against the Purnea Nabob, who he must have looked on as a competitor for his sub- adarry, and yet he waived his resentment against him and marched back directly to attack the English. This does not appear like a pre-meditated design but rather a sudden gust of passion. What prevented you gentlemen [the Governor and the Fort William Council] from using proper means to mollify him while on his march I do not know….[৪৪]
হুগলির ডাচ কুঠিয়ালরাও জানাচ্ছে যে ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গকে দুর্ভেদ্য করার জন্য যে-সব নির্মাণকার্য করেছিল, সেগুলি ভেঙে দেবার জন্য নবাবের নির্দেশে তারা কর্ণপাত করেনি। এভাবে তাঁকে অগ্রাহ্য করার জন্যই নবাব কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করেন।[৪৫]
সিরাজদ্দৌল্লার ‘অর্থলিপ্সার’ কোনও প্রমাণ কিন্তু সমসাময়িক নথিপত্রে পাওয়া দুষ্কর, যদিও শুধু হিল সাহেব নন, এমনকী অধুনাও কোনও কোনও ঐতিহাসিক সোজাসুজি বা প্রচ্ছন্নভাবে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন।[৪৬] এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সিরাজ যদি অর্থলোলুপ হতেন, তা হলে কাশিমবাজার কুঠির পতনের পর ইংরেজদের ওখানকার সব ধনসম্পত্তি তিনি অনায়াসে আত্মসাৎ করতে পারতেন। তিনি কিন্তু কিছুতে হাত দেননি, শুধু ইংরেজদের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। তিনি তাদের কাছ থেকে কোনও অর্থও দাবি করেননি। তার চেয়েও বড় কথা, ওয়াটস যে-সব শর্তাবলীতে সই করেছিলেন, তাতেও অর্থের কোনও কথা ছিল না, যদিও এ রকম ক্ষেত্রে অর্থের দাবি করাটা প্রচলিত রীতি ছিল এবং বাংলার পূর্বেকার নবাবরা তা করেছিলেন। সিরাজদ্দৌল্লা যে ইংরেজদের সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর তথাকথিত ‘অর্থলিপ্সা’ যে তাতে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, তা ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি থেকে স্পষ্ট: ‘নবাব যে একটা আপস-মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন তার প্রমাণ তিনি কাশিমবাজারে যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম ছাড়া কোম্পানির অন্য কোনও জিনিসে হাত পর্যন্ত দেননি।’[৪৭] পরে অবশ্য কলকাতা আসার পথে নবাবের দেওয়ান ও সেনাপতি দুর্লভরাম ওয়াটস ও কোলেটের কাছে অর্থের দাবি করেন—নবাব নন—তাও খুব একটা জোর দিয়ে নয়, অনেকটা তাদের যাচাই করার জন্য, অর্থের বিনিময়ে ইংরেজরা নবাবের কলকাতা অভিযান বন্ধ করতে রাজি কি না দেখতে হয়তো।[৪৮] ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের অনেকে অবশ্য ভেবেছিল কিছু টাকাপয়সা দিয়ে নবাবের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করা যেত কিন্তু ইংরেজদের প্রতি সিরাজদৌল্লার অসন্তোষ এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে শুধু অর্থ দিয়ে তা দূর করা সম্ভব ছিল না বলেই মনে হয়। অবশ্য এটা ঠিক যে, কলকাতা দখল করার পর মুর্শিদাবাদ ফেরার পথে তিনি ডাচদের কাছ থেকে সাড়ে চার লক্ষ টাকা ও ফরাসিদের থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা নজরানা হিসেবে নিয়েছিলেন।[৪৯] কলকাতার ইংরেজ কোষাগারে নবাব মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার মতো পেয়েছিলেন। এখানে স্মর্তব্য, বাংলার সব নবাবই কোনও যুদ্ধজয়ের পর বা ওরকম উপলক্ষে বিদেশি বণিক ও দেশীয় সওদাগরদের কাছ থেকে প্রথাগত নজরানা আদায় করতেন—নজরানার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে বেশিও হত। তবু বেছে বেছে অর্থলিপ্সার অপবাদ সিরাজের ঘাড়ে চাপানো কেন?
সিরাজদ্দৌল্লার কলকাতা আক্রমণের সময় ইংরেজ কোম্পানির যে ক্ষয়ক্ষতি হয় (আনুমানিক বারো লক্ষ টাকার মত[৫০]) তা মূলত সংঘর্ষের সময় অগ্নিকাণ্ডের জন্যই। লুঠতরাজ অবশ্য হয়েছিল সন্দেহ নেই। ইংরেজ কোম্পানির সরকারি ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমের (Robert Orme) মতে তার জন্য দায়ী ছিলেন রাজা মানিকচাঁদ, সিরাজ নন। পরে সিরাজ তাঁকে এজন্য কারাদণ্ড দেন এবং দশ লক্ষ টাকা জরিমানা দিয়ে তিনি শেষে মুক্তি পান।[৫১] সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে অর্থলোলুপতার অভিযোগ যে কত অসার এবং তা যে দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধের জন্য একেবারেই দায়ী নয় তা এক অজ্ঞাতনামা ইংরেজের লেখা [লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত] পাণ্ডুলিপি থেকে স্পষ্ট। ওই লেখক বলছেন: ‘বাংলার সুবাদার [সিরাজদ্দৌল্লা] যা চেয়েছিলেন তা মোটেই অর্থ নয়—অর্থের ব্যাপারটা ছিল নিতান্তই গৌণ। তিনি আসলে চেয়েছিলেন, ইউরোপীয়রা নিজেদের সুসংহত করার জন্য দুর্গগুলিকে যেভাবে দুর্ভেদ্য করে তুলছিল, তার সম্পূর্ণ অবসান।[৫২] এমনকী যে হলওয়েল সিরাজের প্রতি মোটেই সদয় ছিলেন না, তাঁর ব্যাপারও প্রমাণ করে যে, সিরাজ মোটেই অর্থগৃধ্নু ছিলেন না। কলকাতার পতনের পর যখন হলওয়েলকে বন্দি হিসেবে নবাবের কাছে উপস্থিত করা হল, তখন তিনি নবাবকে জানান যে, যুদ্ধের ফলে তাঁর ব্যক্তিগত অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও নবাবকে ভাল পরিমাণ অর্থ দিয়েই তিনি তাঁর মুক্তি কিনতে চান। সিরাজ এর উত্তর দিয়েছিলেন: ‘হলওয়েলের টাকা থাকলে তাঁর নিজের কাছেই থাক। তাঁর অনেক যন্ত্রণাভোগ হয়েছে, তাঁকে মুক্তি দেওয়া হোক।’[৫৩] এ থেকে একটা জিনিস সুস্পষ্ট যে সিরাজদ্দৌল্লা অর্থলোলুপ ছিলেন না এবং অন্তত কিছুটা মানবিকতাবোধও তাঁর মধ্যে ছিল। বেশির ভাগ ঐতিহাসিক তাঁকে যতটা ‘অমানুষ’ ভাবেন, ততটা ‘অমানুষ’ হয়তো তিনি ছিলেন না।
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑S.C. Hill, Bengal in 1756-57, vol. I. Introduction. p. iiii.
- ২.↑P. J. Marshall, Bengal, pp. 67, 75-77, 80, 91-92; C. A. Bayly, Indian Society, pp. 49-50; Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration’, IHR, pp. 7,8,11,12 মার্শাল এখন (Bengal, p.77) তাঁর আগের বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে এসেছে। আগে তিনি বলেছিলেন, ‘ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের সম্পর্কে ধস নামে যখন সিরাজদ্দৌল্লা কলকাতা আক্রমণ করলেন।’ (East Indian Fortunes,, Oxford, 1976)। বেইলি এবং রজতকান্ত রায় এখনও বলছেন, ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার বিরোধ আরও ‘ঘনীভূত হল যখন সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের বাংলা থেকে তাড়িয়ে তাদের ধনসম্পত্তি দখল করতে চাইলেন, Bayly, Indian Society, p. 47. Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration’, p. 12; পলাশীর ষড়যন্ত্র, পৃ. ৩২।
- ৩.↑P. J. Marshall, Bengal, pp. 56, 63; Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration’, p. 6.
- ৪.↑Law’s Memoir, Hill, III, p. 163.
- ৫.↑Hill, I, p. XXXI; Law’s Memoir, Hill, III, p. 161.
- ৬.↑Hill, I, p. lii; Law’s Memoir, Hill, III, p. 161.
- ৭.↑Mss. Eur. D. 283,f. 26.
- ৮.↑লন্ডনে কোম্পানির পরিচালক সমিতিকে (Court of Directors) লেখা হলওয়েলের চিঠি, ৩০ নভেম্বর ১৭৫৬, Hill, II, pp. 15-16.
- ৯.↑কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা উইলিয়াম ওয়াটসের চিঠি, ৩০ জানুয়ারি ১৭৫৭; Beng. Letters Recd, vol. 23, f. 386.
- ১০.↑ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখা ম্যাথিউ কোলেটের চিঠি, ২২ জানুয়ারি ১৭৫৭, Hill, II, p. 129.
- ১১.↑ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখা রিচার্ড বেচারের চিঠি, ২৫ জানুয়ারি ১৭৫৭, Hill, 11. p. 162.
- ১২.↑Annex to Consults., 27 Nov. 1752, BPC, vol. 25, f. 30la.
- ১৩.↑BPC, Range 1, vol. 25, f. 251, 18 Sept. 1752.
- ১৪.↑Quoted in K. K. Datta, Sirajuddaullah, p. 5.
- ১৫.↑ঐ।
- ১৬.↑Evidence of John Cooke, Orme Mss., India IV, ff. 804-5; Hill, III, p. 290.
- ১৭.↑Hill, I, pp. XXX-XXXI: Law’s Memoir, Hill, III, pp. 160-62.
- ১৮.↑ঐ, পৃ. ১৬০-১৬২।
- ১৯.↑ঐ, পৃ. ১৬৩।
- ২০.↑S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, p. 41.
- ২১.↑ডুপ্লেকে লেখা রেনল্টের চিঠি, চন্দননগর, ২৬ আগস্ট ১৭৫৬, Hill, I, p. 207.
- ২২.↑Law’s Memoir, Hill, III, pp. 162-64.
- ২৩.↑Hill, III, p. 219.
- ২৪.↑কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা হলওয়েলের চিঠি, ১০ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, III, p. 349.
- ২৫.↑Drake’s Narrative,, 19 July 1756, Hill, I, pp. 122-23.
- ২৬.↑সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ২০৫।
- ২৭.↑ড্রেককে লেখা রিচার্ড বেচারের চিঠি, ২২ মার্চ ১৭৫৭, Beng. Letters Recd., vol. 23, f. 460.
- ২৮.↑সিরাজদ্দৌল্লার চিঠি কলকাতায় পৌঁছয় ১৫ এপ্রিল ১৭৫৬, Drake’s Narrative, Hill, I, p. 125. ঢাকায় থাকাকালীন রাজবল্লভ দুই কোটি টাকার ওপর আত্মসাৎ করেছিলেন, W. W. Hunter, Statistical Account of Bengal, vol.V, p. 123. ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখা ড্রেকের চিঠি, ১৭-২৫ জানুয়ারি ১৭৫৭, Hill, II, pp. 136-39. কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা হলওয়েলের চিঠি, ১০ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, III, p. 348; কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা উইলিয়াম ওয়াটসের চিঠি, ৩০ জানুয়ারি ১৭৫৭, Beng. Letters Recd., vol. 23, ff. 377-78; কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা ঢাকার ইংরেজ কুঠির চিঠি, ১৮ জুলাই ১৭৫৬; C. & B. Abstracts, vol. 6, f. 118; Beng. Letters Recd., vol. 23, f. 239.
- ২৯.↑অন্যদিকে রিচার্ড বেচার লিখেছেন যে ‘কী কারণে’ নারায়ণ সিংকে ছদ্মবেশে কলকাতা ঢুকতে হল, তা তাঁর কিছুতে বোধগম্য হচ্ছে না। তাই তাঁর ‘দৃঢ় বিশ্বাস যে নারায়ণ সিং মোটেই ছদ্মবেশে কলকাতা ঢোকেননি।’ ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখা রিচার্ড বেচারের চিঠি, ২৫ জানুয়ারি ১৭৫৭, Hill, II, p. 159.
- ৩০.↑Drake’s Narrative, 19 July 1756, Hill, I, pp. 124-26; কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা হলওয়েলের চিঠি, ৩০ নভেম্বর ১৭৫৬, Hill, II, pp. 8-9; কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসে লেখা ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি, চন্দননগর, ১৬ জুলাই ১৭৫৬, Hill, I, pp. 100-101; কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা ওয়াটসের চিঠি, ৩০ জানুয়ারি ১৭৫৭, Beng. Letters Recd., vol.23, f. 378.
- ৩১.↑কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা ওয়াটসের চিঠি, ৩০ জুন ১৭৫৭, Beng. Letters Recd., vol. 23, f. 379; Hill, III, p. 332.
- ৩২.↑Law’s Memoir, Hill, III, p. 165.
- ৩৩.↑হুগলির ডাচ কাউন্সিলের গোপন আলোচনা [Secret Consultations], হুগলি, ২৮ জুন ১৭৫৬, Hill, I, p. 37.
- ৩৪.↑Law’s Memoir, Hill, III, p. 165; vol. I, pp. xlviii-xlix.
- ৩৫.↑কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা ওয়াটসের চিঠি, ৩০ জুন ১৭৫৬, Beng. Letters Recd., vol. 23, f. 379, Hill, I, p. xlix-l; করম আলি, মুজাফ্ফরনামা, পৃ: ৬৩; কে. কে. দত্ত, সিরাজদ্দৌল্লা, পৃ: ১৬।
- ৩৬.↑Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 52.
- ৩৭.↑করম আলি, মুজাফ্ফরনামা, পৃ. ৬৩-৬৪। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হল সিয়রে-র লেখক গোলাম হোসেন খানের সিরাজের প্রতি বিরূপ মনোভাব। তিনি এক জায়গায় বলছেন, সিরাজ ‘কারও সঙ্গে আলোচনা করতে বা কারও পরামর্শ নিতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক ছিলেন না’ এবং ‘কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই শুধুমাত্র নিজের অভিপ্রায় অনুযায়ী এই অনভিপ্রেত ও অশুভ অভিযানে [কাশিমবাজার ও কলকাতা আক্রমণ] লিপ্ত হয়ে পড়েন।’ কিন্তু পরে গোলাম হোসেন নিজের উক্ত বক্তব্যের সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেছেন—তিনি লিখেছেন: ‘সিরাজ যাদের সঙ্গে [এ ব্যাপারে] পরামর্শ করেছিলেন, তারা সিরাজের অপছন্দ হতে পারে এমন কোনও পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।’ সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৮-৮৯।
- ৩৮.↑ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি, ফোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিলকে লেখা, চন্দননগর, ৭ জুলাই ১৭৫৬, Hill, I, p. 58; কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি, চন্দননগর, ১৬ জুলাই ১৭৫৬, Hill, I, p. 104.
- ৩৯.↑Hill, I, pp. 62-63.
- ৪০.↑Hill, II, pp. 142-43.
- ৪১.↑কোম্পানিদের জব্দ করতে বা তাদের বেচাল দেখলে বাংলার নবাবরা অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে কোম্পানির কুঠি বা বাণিজ্য অবরোধ করে তাদের সোজা পথে আনার চেষ্টা করতেন।
- ৪২.↑ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখা ফ্রান্সিস সাইকসের [Francis sykes] চিঠি, কাশিমবাজার, ৪ জুন ১৭৫৬, Hill, I, p. 10.
- ৪৩.↑জাঁ ল’-র তথ্য [Law’s Memoir, Hill, III, 166] অবলম্বন করে হিল জানাচ্ছেন যে ওয়াটসের হাত দুটি পেছনে বাঁধা অবস্থায় তাঁকে বন্দি হিসেবে সিরাজের সামনে উপস্থিত করা হয় (Hill, I, p. lix)| অন্যদিকে উইলিয়াম টুক লিখছেন যে ওয়াটসের হাত দুটি একটা রুমাল দিয়ে মোড়া হয়েছিল, শুধুমাত্র ওয়াটসের বশ্যতা স্বীকার বোঝাবার জন্য (Tooke’s Narrative, Hill, I, p. 252)৷ এটা যদিও বলা হয় যে ওয়াটস এবং কোলেট দু’জনকেই বন্দি করে রাখা হয়েছিল, তাঁরা কেউ কিন্তু এই অভিযোগ করেননি যে তাঁদের হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছিল (ফোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিলকে লেখা ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি, ২ জুলাই ১৭৫৬, Hill, I, p. 46; কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি, Hill, I, p. 10)। এখানে উল্লেখযোগ্য যে সাইকস ও কোলেট, যাঁরা দুজনেই তখন কাশিমবাজারে ছিলেন, ৪ জুন ১৭৫৬-তে লিখছেন যে নবাব কলকাতা রওনা হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ওয়াটস, কোলেট ও বেটসনকে সঙ্গে নিয়ে যান, কিন্তু বন্দি করে নিয়ে যান, এমন কথা লেখেননি (ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখা কোলেটের চিঠি, ৪ জুন ১৭৫৬, Hill, I, p. 9; সাইকসের চিঠি, ৪ জুন ১৭৫৬, Hill, I, p. 10)। একটা বেশ চালু গল্প হচ্ছে যে ওয়াটস সিরাজের পা জড়িয়ে ধরে ‘আমি তোমার গোলাম’, ‘আমি তোমার গোলাম’ বলে কান্নাকাটি করেছিলেন। সেটা নেহাতই বাজারে গল্প, যার কোনও ভিত্তি নেই। এমনকী হিল পর্যন্ত এটা বিশ্বাস করেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও কোনও কোনও ঐতিহাসিক এ গল্পের পুনরাবৃত্তি করার লোভ সামলাতে পারেন না। যেমন রজতকান্ত রায়, পলাশী, পৃ. ২৬, ২৯; ‘Colonial Penetration’, p. 10.
- ৪৪.↑ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখা রিচার্ড বেচারের চিঠি, ২৫ জানুয়ারি ১৭৫৭, Hill, II, p. 161. জোরটা আমি দিয়েছি।
- ৪৫.↑ব্যাটাভিয়াতে লেখা হুগলি ডাচ কাউন্সিলের চিঠি, ৫ জুলাই ১৭৫৬, Hill, I, p. 53.
- ৪৬.↑Rajat Kanta Ray, পলাশী,, পৃ. ১৫৬; C. A. Bayly, Indian Society, pp. 49-50; P, J. Marshall, Bengal, p. 76.
- ৪৭.↑কোর্ট অফ ডাইরেক্টরসকে লেখা ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি, ১৬ জুলাই ১৭৫৬, Hill, I. p. 103; কোর্টকে লেখা ওয়াটসের চিঠি, ৩০ জানুয়ারি ১৭৫৭, Hill, III, p. 336.
- ৪৮.↑Hill, I, pp. 58, 60, 103, 118; III, p. 336.
- ৪৯.↑Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 80.
- ৫০.↑ঐ, পৃ. ৮১-৮২।
- ৫১.↑Robert Orme, Military Transactions, II, p. 147.
- ৫২.↑Mss. Eur. D. 283, f. 27.
- ৫৩.↑Holwell’s Narrative, Hill, III, p. 152.