ছার্চোপ্পর

পাখির খাতা

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

সারাদিন গুমোট গরম। শেষরাতে সেই যে একটু বৃষ্টি হয়ে ভোরবেলাটা একটু ঠান্ডা হয়েছিল, বেলা বাড়তেই আবার যে-কে সেই। চড়া রোদে গাছপালা পর্যন্ত ধুঁকছে।

আমি একটা আগুন-ঢালা বিরাট মাঠের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ কাকেদের ‘আ! আ!’ শুনে রোদ ভুলে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখি দুটো কাক গরমের কষ্টে ‘আ! আ!’ করতে-করতে মাঠে নামলো। মাঠের ছোটো একটা গর্তে শেষ রাতের বৃষ্টির জল জমে আছে, কাক দুটো সেই জলে চান করতে এসেছে।

গর্তের পাড়ে বসে কাক দুটো একসঙ্গে গর্তের জলে একবার করে মাথা ডুবোয় আর আকাশের দিকে মুখ তুলে বলে, ‘আ! আ!’ এটা আরামের আ-আ। গরমে চান করতে পেরে কার না প্রাণ ঠান্ডা হয়!

তারা চান করেই চলেছে, দেখে মনে হয়- সূর্য অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত তারা বুঝি জল ছেড়ে নড়বে না। এমন সময় কোত্থেকে একটা হাঁড়িচাচাপাখি এসে সেই গর্তের জলে ডুব দিতে গেল। দেখে কাক দুটো একসঙ্গে, ‘যা, যা’ বলে হাঁড়িচাচাকে তেড়ে গেল। হাঁড়িচাচা তো ভয়ে বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে গরমে হাঁসফাঁস করতে লাগলো। তারপর একটু দম নিয়ে রাগে গরগর করতে-করতে বললো, ‘ছার্চোপ্পর! ছার্চোপ্পর!’ ছার্চোপ্পর মানে স্বার্থপর।

কথাটা দুটো কাকেরই কানে গিয়েছিল। তারা চান থামিয়ে ‘ক্যায়া? ক্যায়া?’ বলে হাঁড়িচাচার পিছু ধাওয়া করলো।

হাঁড়িচাচা এবার প্রাণের ভয়ে সুরুৎ করে উড়ে এসে আমারই কাঁধে বসে বলে উঠলো ‘বাঁচাও, বাঁচাও।’

আমি দেখলাম কাক দুটো আমার মাথার ওপর খুব কাছেই ঘোরাঘুরি করছে। আমি কাঁধ থেকে পাখিটাকে নামিয়ে হাত দিয়ে ঢেকে রাখলাম। কাক দুটো তখন সুর করে বলতে লাগলো, ‘বা, বা! বা, বা!’ তার মানে কাক দুটো বলতে চাইছে, তুমি শুধু হাঁড়িচাচার দিকটাই দেখলে, ও যে আমাদের স্বার্থপর বলে গাল দিলো সে-বেলায় কিছু নয়!

ছার্চোপ্পর ❀ নজরুল রচনাবলী