কুহেলিকা

ভূমিকা

লেখক: রকিবুল হাসান

কাজী নজরুল ইসলাম

এই ভূমিকাটি মূল গ্রন্থের অংশ নয়

পরাধীন দেশে শাসকের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি মানেই বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া। এর ফলে লেখককে যেকোনো ধরনের মূল্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো। অন্য যেকোনো সাধারণ সময়ের চেয়ে বিপ্লবী সময়ের সাহিত্য যেমন অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এসব সাহিত্যিকও জাতির কাছে চির সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হন। ভারতের পরাধীনতার যন্ত্রণার বিষাক্ত ছোবলে নানামাত্রিক সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে অগ্নিফসলের মতো। বাংলার প্রায় সব প্রধান লেখকই সে অগ্নিকালকে ধারণ করে অগ্নিসাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থেকেছেন দৃঢ় প্রত্যয়, ঘটিয়েছেন অপ্রতিরোধ্য জাগরণ। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাতে সে সত্য প্রতিষ্ঠিত।

একদিকে অহিংস বা আপসকামিতা, অন্যদিকে ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পরাধীনতা থেকে মুক্তির পন্থা। সাহিত্য সৃষ্টিতেও তা লক্ষণীয়। কবিতা, নাটক বা প্রবন্ধে অথবা গল্পের মতো উপন্যাসও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’, ‘গোরা’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘কুহেলিকা’ ও সতীনাথ ভাদুড়ির ‘জাগরি’ এ ধারায় অগ্রগণ্য উপন্যাস।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ স্বদেশি আন্দোলনভিত্তিক রাজনৈতিক উপন্যাস না হলেও কালের যাত্রায় রাজনৈতিক উপন্যাসের তিলকটিই এ উপন্যাসের কপালে লেগে গেছে। বঙ্কিমচন্দ্র সচেতনভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ কোনো উপন্যাস রচনা করেননি। স্বদেশি প্রেক্ষাপটে রচিত বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ একদিকে সাহিত্যিক-চিত্তে যেমন আলোড়ন তৈরি করেছিল, তেমনি বিপ্লবীদের বিপ্লবী-দীক্ষা নিতেও উদ্বুদ্ধ করেছিল। এ উপন্যাসের মাধ্যমেই বঙ্কিমচন্দ্র নিজেকে ‘জাতিসংগঠক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এ উপন্যাসে ব্যবহৃত ‘বন্দেমাতরম্’ গানটি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

রবীন্দ্রনাথের গল্পে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন কখনও কখনও জায়গা করে নিলেও উপন্যাস হিসেবে পাওয়া যায় ‘ঘরে-বাইরে’। স্বদেশি আন্দোলনকে ঘিরে এ উপন্যাস রচিত হলেও রাজনৈতিক পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হিসেবে এটিকে অভিহিত করা যায় না। কারণ স্বদেশি আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপ এ উপন্যাসে ধরা পড়েনি। সন্দ্বীপের ভেতর দিয়ে স্বদেশি আন্দোলন বরং এখানে বিকৃত রূপ লাভ করেছে। বিমলা চরিত্রের ভেতর দিয়েই বোঝা যায় সে সময়ের নারীরা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য কতটা উদগ্রীব ছিল। দেশের মুক্তির স্বার্থে তারা কতটা নিবেদিত ছিল। নিখিলেশ চরিত্রে উঠে এসেছে সে সময়ের আরেক বাস্তবতা- ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধীরস্থির আপসকামিতা। অগ্নিযুগের পুরোপুরি রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে ‘ঘরে-বাইরে’ মান্য করা যায় না।

শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ রাজনৈতিক উপন্যাস। শরৎচন্দ্র নিজেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু খাঁটি রাজনৈতিক উপন্যাস তিনি একটিই লিখেছেন- ‘পথের দাবী’। কিন্তু একটিমাত্র ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সব্যসাচী বাস্তবতা থেকেই গৃহীত হয়েছিল। স্বদেশি আন্দোলনের বিখ্যাত নেতা এমএন রায়ের চরিত্র অবলম্বনে তিনি সব্যসাচী চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। এমএন রায় জার্মানি থেকে অস্ত্র-বারুদ ও অর্থ সাহায্য নিয়ে সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে ব্রিটিশ বিতাড়িত করে ভারতকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। ‘পথের দাবী’র মূল চরিত্র সব্যসাচী তৈরি হয়েছে এমএন রায়কে কেন্দ্র করে। ‘পথের দাবী’ বিপ্লবীদের কাছে আদর্শগ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছিল।

নজরুলের ‘কুহেলিকা’ উপন্যাস ‘পথের দাবী’ প্রভাবিত বলেই ধারণা করি। এ উপন্যাসের প্রমত্ত দা ও বজ্রপাণি মূলত এমএন রায় ও বিপ্লবী বাঘা যতীন চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসেও এমএন রায় চরিত্রটিকেই তিনি প্রধান চরিত্র হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন। ‘কুহেলিকা’তে এমএন রায় চরিত্রটি ‘বজ্রপাণি’ চরিত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম অবিশ্বাস্য খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তবে ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতে না পারলেও তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে চেতনা ও দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত, তার মূল্য অনেক। একই সঙ্গে ব্যক্তি নজরুলকেও পাঠ করার জন্য তার উপন্যাস বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আর একটি ব্যাপার, নজরুলের উপন্যাসের মান যে পর্যায়ের হোক না কেন, তার অবিসংবাদিত কবিখ্যাতির কারণে উপন্যাসগুলো বহুল পঠিত। বিশেষ করে তার ‘কুহেলিকা’ এখনও পাঠকের অধিক আগ্রহের বিষয়।

‘কুহেলিকা’র চরিত্রের সঙ্গে ‘পথের দাবী’র সব্যসাচীর চরিত্রের মিল স্পষ্ট। প্রমত্ত চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে নজরুলের স্কুলশিক্ষক নিবারণ চন্দ্র ঘটকের প্রভাব রয়েছে। প্রমত্ত-চরিত্র তৈরিতে নজরুলের মনে তার স্কুলশিক্ষক নিবারণ ঘটকের ছায়া বা প্রভাবের সত্যতা ‘কুহেলিকা’তেই নিহিত আছে। এটি নিয়ে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। কিন্তু যে ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো প্রমত্তের পুরো বিপ্লবী জীবনটা যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তা হলে এ চরিত্রের ভেতর নিবারণ চন্দ্র ঘটক কতখানি আছেন! প্রমত্তের যে নেতা বজ্রপাণি বাস্তবে নিবারণ ঘটকের ক্ষেত্রে তিনি কে? কী সম্পর্ক? আদৌ কি কেউ ছিলেন? এসব প্রশ্নও চলে আসে। নিবারণ ঘটক প্রমত্ত চরিত্র সৃষ্টিতে প্রভাব ফেললেও প্রমত্ত চরিত্রের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবের অন্য বিপ্লবী চরিত্র তার মধ্যে অপরিহার্যভাবে যুক্ত হয়ে গেছে কি না, সেটিও ভাবার সুযোগ রয়েছে।

অগ্নিকালের বাস্তবতা সম্মুখে রেখে নজরুলের বিপ্লবীসত্তা ও তার বিপ্লবী অন্যান্য রচনা বিচার করে ‘কুহেলিকা’র চারিত্র্য বিচারে অগ্রসর হলে সে অনুমান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসটির বিশেষ গুরুত্ব সেখানেই। কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহাঙ্গীর একজন বিপ্লববাদী। জাহাঙ্গীরের গুরু প্রমত্তের চরিত্রে নজরুলের শিক্ষক নিবারণ ঘটকের ছায়া রয়েছে। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’র সব্যসাচীর সঙ্গে প্রমত্তের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে।

তরুণ বিপ্লবীদের কাছে বিনোদবালা ছিলেন পরম শ্রদ্ধা, আশ্রয় ও সাহসের জায়গা। জয়তী চরিত্রটি তৈরির ক্ষেত্রে নজরুলের মনে অবচেতন বা সচেতনভাবে বিনোদবালা প্রভাব রাখতে পারে। ঠিক যেভাবে ‘কুহেলিকা’য় জাহাঙ্গীরদের কাছে জয়তী ছিলেন। আরও একধাপ এগিয়ে ধারণা করে নিতে পারি ‘কুহেলিকা’য় প্রমত্তর নেতা বজ্রপাণি যে চরিত্রটি পরোক্ষভাবে উপন্যাসে উপস্থিত, তার মধ্যে বাঘা যতীনের চরিত্রটি বেশ স্পষ্ট। নজরুলের বিপ্লবী জীবনে বাঘা যতীনের প্রভাব যে স্পষ্ট তা তার কবিতা ও ধূমকেতুতে লক্ষণীয়। নজরুলের ‘প্রলয়-শিখা’ কাব্যগ্রন্থে ‘নব-ভারতের হলদিঘাট’ কবিতা এবং ধূমকেতু পত্রিকায় পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে বাঘা যতীনের ছবি মুদ্রণের ভেতর দিয়ে তার বীরত্বগাথা তুলে ধরেছিলেন।

বাঘা যতীন এমএন রায়রা জার্মানি থেকে অস্ত্র এনে ভারত স্বাধীন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। সে মোতাবেক কাজও করেছিলেন। জার্মানি গিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছিলেন। ‘কুহেলিকা’তে এসব কথা আছে। ‘কুহেলিকা’তে জয়তী চরিত্রটি যখন চোখের সামনে উজ্জ্বল আলোর মতো জ্বলে ওঠে, তখন বাঘা যতীনের দিদি বিনোদবালার ছবিটিও চোখের সামনে চলে আসে। এ যেন বিনোদবালার স্বরূপে বিকশিত জয়তী চরিত্রটি। ঠিক যেভাবে ‘কুহেলিকা’য় জাহাঙ্গীরদের কাছে জয়তী ছিলেন। বজ্রপাণি ও প্রমত্ত দুটি চরিত্র বাঘা যতীন ও এমএন রায়ের চরিত্র অবলম্বনে সৃষ্টি, তা এখন অনুমেয়।

নজরুল বাঘা যতীনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড দ্বারা যে প্রভাবিত হয়েছিলেন তা তার সাহিত্যে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। ভারতমাতাকে মুক্ত করার জন্য বাঘা যতীন ও এমএন রায় যে সশস্ত্র বিপ্লবী প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, ‘কুহেলিকা’র বজ্রপাণি এবং প্রমত্তর ভেতর তা লক্ষণীয়। বাঘা যতীন ও এমএন রায়ের ‘আইকন-তত্ত্ব’ ক্রমশ বিচ্ছুরিত হয়েছে নজরুলের বিচিত্র চরিত্রের আভ্যন্তরিক ও আন্তর্জালিক আবহে। সেক্ষেত্রে ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসের বিধৃত বিপ্লবপন্থা অর্জন করে নতুন মাত্রা। ‘কুহেলিকা’ নজরুল চেতনার নতুন প্রয়াসমাত্র বললেও বিন্দুমাত্র ভুল হয় না।

সাহিত্যের বিপ্লবী ধারা : নজরুলের কুহেলিকা; লেখক: রকিবুল হাসান; দৈনিক সময়ের আলো, অনলাইন সংস্করণ, শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১